ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ‘অজেয়’ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) ‘সারমাট’-এর সফল পরীক্ষা চালিয়েছে রাশিয়া। মঙ্গলবার রাশিয়ার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে এই পরীক্ষা চালানো হয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেই এই ক্ষেপণাস্ত্রটিকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
পুতিনের কড়া হুঁশিয়ারি
মস্কোর ক্রেমলিন থেকে ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে এই পরীক্ষার তদারকি করেন পুতিন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি জানান, পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এই সারমাট ক্ষেপণাস্ত্রটি চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশটির সামরিক বাহিনীতে (কমব্যাট সার্ভিস) অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পশ্চিমা বিশ্বে ‘শয়তান-২’ (Satan II) নামে পরিচিত এই ক্ষেপণাস্ত্রটি নিয়ে পুতিন বলেন, “এর ধ্বংসক্ষমতা যেকোনো পশ্চিমা ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় চার গুণ বেশি। এটি বর্তমান বা ভবিষ্যতের যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম।”
সারমাটের সক্ষমতা ও কারিগরি দিক
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সারমাট ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা বা রেঞ্জ প্রায় ৩৫,০০০ কিলোমিটার (২১,৭৫০ মাইল), যা এটিকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম করে তুলেছে। এটি রাশিয়ার পুরনো ‘ভয়েভোডা’ ক্ষেপণাস্ত্রের স্থলাভিষিক্ত হবে। পুতিন দাবি করেছেন, নতুন এই সংস্করণটি আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল এবং শক্তিশালী।
উল্লেখ্য, ২০১১ সাল থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও মাঝপথে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে একটি ব্যর্থ পরীক্ষার সময় বিশাল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গিয়েছিল। তবে এবারের সফল পরীক্ষা রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হুমকির মুখে বিশ্ব নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি
এমন এক সময়ে রাশিয়া এই শক্তির জানান দিল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক সর্বশেষ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’ (New START) গত ফেব্রুয়ারিতে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। আধা শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম বিশ্বের দুই প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সাজাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য নতুন যেকোনো চুক্তিতে চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে বেইজিং শুরু থেকেই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলছে, তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার তুলনায় অনেক ছোট।
নেপথ্যে ভূ-রাজনীতি
পুতিন তার ভাষণে জানান, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি থেকে সরে আসা এবং পূর্ব ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাল্টা জবাব হিসেবেই রাশিয়া এসব অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে। সারমাট ছাড়াও রাশিয়া ইতিমধ্যে ‘অরেশনিক’ এবং হাইপারসনিক ‘আভনগার্ড’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে, যা শব্দের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি দ্রুত চলতে পারে।
ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধ বিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরপরই রাশিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে রাশিয়ার এই ‘শক্তি প্রদর্শন’ বিশ্বজুড়ে নতুন করে পারমাণবিক যুদ্ধের আতঙ্ক তৈরি করেছে।
সূত্র- আল-জাজিরা