১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

​”স্মার্টফোনে বন্দি শৈশব-যৌবন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি আসলে বিচ্ছিন্নতার মাধ্যম?”

আলোকোজ্জ্বল পর্দার ওপারে এক নিবিড় অন্ধকার দানা বাঁধছে। যে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়, সেই প্রযুক্তির আড়ালেই মানুষ ক্রমশ একা হয়ে পড়ছে। মানুষের প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব ভাষা তৈরি করলেও বর্তমানের ডিজিটাল ভাষা যেন আবেগহীন এক যান্ত্রিক সংকেতে পরিণত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এই যুগে সংযোগ বাড়লেও কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে মানবিক স্পর্শের সেই আদিম উষ্ণতা।

​পরিসংখ্যানে সংযোগ, বাস্তবে শূন্যতা
​২০২৪ সালের বিশ্বজনীন পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ ইন্টারনেটে যুক্ত। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। দেশে ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে তরুণরা গড়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছেন ভার্চুয়াল জগতে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক, কিন্তু পর্দার পেছনের চিত্রটি ভয়াবহ।

​বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও জরিপের তথ্য বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতি-সক্রিয়তা আদতে মানুষের নিঃসঙ্গতাকে বাড়িয়ে তুলছে। দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাটানো ব্যক্তিদের মধ্যে বিষণ্নতা ও বিচ্ছিন্নতার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।

​আত্ম-উপস্থাপনার ফাঁদ ও ‘সোশ্যাল কম্পারিজন’
​সমাজতাত্ত্বিকরা বলছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের জীবনকে একটি ‘সম্পাদিত সংস্করণে’ রূপান্তর করেছে। মানুষ এখন তার জীবনের কেবল সাফল্যের গল্পগুলোই জনসমক্ষে আনে, আড়ালে থেকে যায় ব্যর্থতা ও সংগ্রাম। অন্যের এই কৃত্রিম উজ্জ্বল জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ এক প্রকার ‘অস্তিত্বগত শূন্যতায়’ ভুগছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘সোশ্যাল কম্পারিজন এফেক্ট’। এটি কেবল আত্মসম্মানই কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং মানুষকে এক অদৃশ্য মানসিক চাপের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

​সম্পর্কের গভীরতা ও ভঙ্গুর যৌবন
​বর্তমান যুগে সম্পর্কের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। আগেকার দিনের সহনশীলতা ও অভিজ্ঞতার জায়গা দখল করেছে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। ‘ব্লক’ বা ‘আনফলো’ করার সহজলভ্যতা মানুষকে সম্পর্কের দায়বদ্ধতা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সহমর্মিতার জায়গাটি দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

​সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম। একটি বৈশ্বিক জরিপ অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ৬০ শতাংশ মনে করে সোশ্যাল মিডিয়া তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। তাদের আত্মপরিচয় এখন লাইক, শেয়ার আর ফলোয়ারের সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং অস্থির।

​সংকটের মূলে শুধু প্রযুক্তি নয়
​বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের জন্য কেবল প্রযুক্তি দায়ী নয়। বরং আধুনিক মানুষের অতি-ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া এবং নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে ভার্চুয়াল জগতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মানুষ একা থেকেও জনাকীর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একা না থাকার ভান করছে।

​উত্তরণের পথ: প্রযুক্তির মানবিক ব্যবহার
​তবে এই অন্ধকারই শেষ কথা নয়। প্রযুক্তির ব্যবহারের ধরন বদলে এই সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বাস্তব সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রযুক্তিতে সংযমী থাকেন, তাদের মানসিক অবস্থা অনেক বেশি স্থিতিশীল।

​সিদ্ধান্তের সময় এখনই:
একটি নোটিফিকেশন উপেক্ষা করে প্রিয় মানুষের পাশে বসা কিংবা ইমোজির বদলে সশরীরে উপস্থিত হয়ে একটু হাসি বিনিময় করা আজ সময়ের দাবি। প্রযুক্তি যেন মানুষকে গ্রাস না করে, বরং মানুষ যেন প্রযুক্তির ভেতরেই তার হারানো মানবিকতাকে খুঁজে পায়—সেটিই হোক আগামীর লক্ষ্য। কারণ, শেষ পর্যন্ত মানুষ কেবল দৃশ্যমান হতে চায় না, সে চায় অপরের হৃদয়ে একটু জায়গা করে নিতে।

​মতামত: লেখক একজন সাবেক অধ্যক্ষ ও কলামিস্ট। (মূল প্রবন্ধের ভাবানুসারে সম্পাদিত)

সর্বশেষ