১৮ ডিসেম্বর, ২০২২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে তিল ধারণের জায়গা নেই। লিওনেল মেসির গোলের পর হাজার হাজার মানুষের সেই গগণবিদারী চিৎকার পৌঁছে গিয়েছিল ফিফার সদর দপ্তর পর্যন্ত। বাংলাদেশের সেই ফুটবল উন্মাদনার ছবি দেখে ফিফা মুগ্ধ হয়ে লিখেছিল, ‘ফুটবল মানুষকে যেভাবে মেলায়, তা আর কিছু পারে না।’
কিন্তু সেই উন্মাদনায় এবার বড়সর এক ধাক্কা লাগতে পারে। আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে বসতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। অথচ হাতে মাত্র এক মাস সময় থাকলেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি বাংলাদেশে খেলা দেখা যাবে কি না। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি—কোনো পক্ষই এখনো সম্প্রচার স্বত্ব (Broadcasting Rights) কেনেনি।
বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি টাকা
এবারের বিশ্বকাপের জন্য বাংলাদেশে ফিফার প্রতিনিধি সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেড’। তারা এই স্বত্বের বিনিময়ে বিটিভির কাছে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা দাবি করেছে। এর সাথে কর (Tax) যুক্ত করলে খরচ দাঁড়াবে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি।
শর্ত অনুযায়ী, এই অর্থের ৫০ শতাংশ আগামী ১০ মের মধ্যে পরিশোধ করার কথা ছিল, যা ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। অবশিষ্ট টাকা পরিশোধের শেষ সময় ১০ জুন। বিটিভি সূত্র জানিয়েছে, ২০২২ বিশ্বকাপে বিশেষ বাজেটে ৯৮ কোটি টাকা খরচ করলেও এবার অঙ্কটা দ্বিগুণ হওয়ায় তারা দ্বিধায় আছে।
ফিফার নীরবতা ও বিটিভির মেইল
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে খরচ কমাতে বিটিভি সরাসরি ফিফার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তারা ফিফাকে দুটি ই-মেইল পাঠালেও কোনো উত্তর মেলেনি। অন্যদিকে, কেবল বাংলাদেশ নয়—রয়টার্সের তথ্যমতে, চীন ও ভারতের মতো বড় দেশেও এবারের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
বেসরকারি খাতের অনাগ্রহ কেন?
২০২২ সালে নাগরিক টিভি এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ‘টফি’ খেলা দেখালেও এবার তারা অনেকটাই পিছুটান দিচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ দুটি:
১. সময়ের পার্থক্য: এবার অধিকাংশ খেলা হবে গভীর রাত বা ভোরে, ফলে দর্শক সমাগম কম হওয়ার আশঙ্কা।
২. অর্থনৈতিক মন্দা: বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনের অর্থ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
টফির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা এখনো বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।
সরকার কী ভাবছে?
তাহলে কি এবার বাংলাদেশে বড় পর্দায় মেসির জাদুকরী পাস বা এমবাপ্পের দৌড় দেখা যাবে না? এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী জানান, বুধবার একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক রয়েছে যেখানে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হবে।
অন্যদিকে, স্প্রিংবক পিটিই লিমিটেডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানান, বিটিভি কোনো পাল্টা প্রস্তাব (Counter Offer) না দেওয়ায় আলোচনা এগোয়নি। তবে সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে তারা ‘গ্রহণযোগ্য মুনাফা’ রেখে স্বত্ব দিতে রাজি আছেন।
”আমরা ফুটবলপ্রেমী জাতি। এখানে বিশ্বকাপ দেখানো হবে না—এটা ভাবাই যায় না। সেটা সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো মাধ্যমেই হোক, খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করতেই হবে।”
— ফাহাদ করিম, সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)
বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এখন ফুটবলপ্রেমীদের চোখ সরকারের সিদ্ধান্তের দিকে। শেষ মুহূর্তে কোনো সমাধান না এলে চার বছর পর বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ থেকে বঞ্চিত হতে পারে লাল-সবুজের সমর্থকেরা।