হজের জন্য ইরানের ওপর সামরিক হামলা স্থগিত করলেন ট্রাম্প

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র হজ পালনের সময়ে যুদ্ধ শুরু করলে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হবে এবং বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচল স্থবির হয়ে পড়বে—উপসাগরীয় মিত্র ও নিজস্ব কর্মকর্তাদের এমন তীব্র সতর্কবার্তার পর চলতি সপ্তাহে ইরানের ওপর পরিকল্পিত সামরিক হামলা স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’ এক প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দুজন শীর্ষ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ট্রাম্পকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল যে হজের মতো পবিত্র সময়ে ইরানের ওপর হামলা চালালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হবে। কারণ, যুদ্ধ শুরু হলে সেখানে আসা লাখ লাখ হাজি মাঝপথে আটকে পড়বেন।

সূত্রগুলো আরও জানায়, পবিত্র ঈদুল আজহার আগের এ পবিত্র দিনগুলোতে হামলা চালানো হলে মুসলিম বিশ্বে ওয়াশিংটনের গ্রহণযোগ্যতা চিরতরে তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাও এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ট্রাম্পের নিজস্ব কর্মকর্তারাই তাকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে এই মুহূর্তে ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল’ যুদ্ধ পুনরুজ্জীবিত করলে ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ‘মারাত্মক ক্ষতি’ হবে।

এর আগে, পবিত্র রমজান মাসেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছিল। তবে হজের সময়ে হামলা চালালে সৌদি আরবের জন্য তা এক বিশাল লজিস্টিক বা ব্যবস্থাপনার সংকট তৈরি করবে, কারণ প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখের বেশি বিদেশি মুসলিম সেখানে সমবেত হন। শুধু সৌদি আরবই নয়, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো উপসাগরীয় বিমান চলাচলের প্রধান হাব (কেন্দ্র) এবং দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো—যেখান থেকে লাখ লাখ মানুষ হজে যান, তাদের সব ফ্লাইটও চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। চলতি বছরের হজ আগামী ২৪ মে থেকে শুরু হতে যাচ্ছে এবং এরই মধ্যে লাখ লাখ হজযাত্রী সৌদি আরবে অবস্থান করছেন।

যুদ্ধ কি তবে অনিবার্য?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিডল ইস্ট আই-এর সঙ্গে কথা বলা তিন কর্মকর্তাই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, হজ শেষ হওয়ার পরপরই আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে।

ইরানিদের অসতর্ক রাখতে এবং এক ধরণের মিথ্যা সুরক্ষার আভাস দিতে অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র এমন রণকৌশল ব্যবহার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যখন তারা ইরানের ওপর আকস্মিক হামলা চালায়, তার ঠিক আগেই জেনেভায় ইরানিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার অগ্রগতির একটি কৃত্রিম আবহ তৈরি করা হয়েছিল।

এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প নিজেই তার সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছিলেন যে উপসাগরীয় নেতাদের অনুরোধে তিনি মঙ্গলবার রাতের পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করেছেন। ট্রাম্প লেখেন,”কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান আমাকে ইরানের ওপর সামরিক হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধ করেছেন। মহান নেতা ও মিত্র হিসেবে তাদের বিশ্বাস, আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।

আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ইরান তাৎক্ষণিকভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থ লক্ষ্য করে পালটা হামলা চালিয়েছিল। তেহরান ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে আর কোনো আঘাত করা হলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের সব অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে এবং এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে।

এ কারণেই সৌদি আরব, কাতার ও ওমান যেকোনো মূল্যে এই উত্তেজনা থামাতে মরিয়া। কারণ, ইরানের হাত ধরে বিশ্ব জ্বালানির অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরুদ্ধ হয়ে থাকায় ইতিমধ্যেই এসব দেশের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের প্রাথমিক হামলাটি মূলত ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পরও দেশটির সরকারকে উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। খামেনির ছেলে ও তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরান সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলা বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ অক্ষুণ্ন রেখে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

তবে ইসরাইল, যারা ইরানকে তাদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, তারা মার্কিন সেনা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকির তোয়াক্কা না করেই ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগন কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই গোলাবারুদের ঘাটতি এবং ইরানের উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন যে, নতুন করে হামলা চালালে মার্কিন বাহিনীকে চরম বেগ পেতে হতে পারে।

 

সর্বশেষ