ইরান সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের অবসানে ওয়াশিংটনের দেওয়া নতুন প্রস্তাব পর্যালোচনার মাঝে তেহরান সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির। বৃহস্পতিবার তিনি তেহরান সফরে যেতে পারেন বলে ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অবসানে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মাঝে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে ইসলামাবাদ।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে ক্রমবর্ধমান প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যার ঠিক আগের দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ অবসানের আলোচনা বর্তমানে চুক্তি অথবা নতুন করে হামলার মাঝামাঝি এক ‘সন্ধিক্ষণে’ রয়েছে।

গত ৮ এপ্রিল এক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ থামলেও স্থায়ী শান্তি চুক্তির আলোচনা প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। সরাসরি সংঘাতের জায়গা নিয়েছে কথার লড়াই। তবে এই অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে কৃষক—সবাই এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা আইএসএনএ বিস্তারিত কোনও তথ্য না জানিয়ে বলেছে, ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ‘আলোচনা ও পরামর্শ’ চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তেহরান সফরে আসছেন অসীম মুনির। ইরানের অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও একই খবর প্রকাশ করেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে একমাত্র সরাসরি আলোচনা গত এপ্রিলে আয়োজন করেছিল পাকিস্তান। আলোচনার ওই পর্বে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মূল ভূমিকায় ছিলেন। তিনি উভয় প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব প্রদর্শন করেন।

তবে শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অতিরিক্ত দাবি’ করার অভিযোগ তোলে ইরান। এরপর থেকে উভয় পক্ষ একে অপরের কাছে একাধিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আর এই পুরো সময়জুড়েই নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা তাড়া করে বেড়িয়েছে।

বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‌‌‘‘বিশ্বাস করুন, বিষয়টি এখন একেবারে শেষ মুহূর্তে রয়েছে। আমরা যদি সঠিক সাড়া না পাই, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাবে। আমরা সব দিক থেকে প্রস্তুত আছি।’’

তিনি বলেন, একটি চুক্তি ‘খুব দ্রুত’ বা ‘কয়েক দিনের মধ্যেই’ হতে পারে। তবে তেহরানকে ‘শতভাগ সঠিক জবাব’ দিতে হবে বলে সতর্ক করে দেন তিনি।

• কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি

তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বুধবার ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান আক্রান্ত হলে এর ‘কঠোর জবাব’ দেওয়া হবে।

গালিবাফ বলেন, ‘‘শত্রুর প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা প্রমাণ করে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তারা নিজেদের সামরিক উদ্দেশ্য ত্যাগ করেনি এবং নতুন একটি যুদ্ধ শুরু করতে চাইছে।’’

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে তেহরান। এর পাশাপাশি বিদেশে আটকে রাখা ইরানের সম্পদ মুক্ত এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিভিন্ন দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে, জ্বালানি খরচ বাড়তে থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজ দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। যুদ্ধবিরতির কারণে লড়াই থামলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এখনও উন্মুক্ত হয়নি। এই জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন করা হয়।

যুদ্ধ শুরুর আগের মজুত করা তেল ফুরিয়ে আসায় বিশ্ব অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়বে; এমন আশঙ্কার মধ্যে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এখন আলোচনার প্রধান জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে এই অবরোধ আরোপ করেছিল; যার ফলে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শুল্ক ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবল অল্প কিছু জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সারও এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়; যে কারণে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের চড়া মূল্য ও সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলেছে, হরমুজের অচলাবস্থার কারণে ‘বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ খাদ্যমূল্য সংকট’ এবং ‘কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয়’ তৈরি হতে পারে।

সূত্র: এএফপি।

 

সর্বশেষ