৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

পশ্চিমবঙ্গে দিদি না মোদি, উত্তেজনার ৯৬ ঘণ্টা

পশ্চিমবঙ্গে টানা ৯৬ ঘণ্টার টান টান উত্তেজনার অবসান ঘটতে চলেছে আগামীকাল সোমবার। দুপুরের মধ্যেই সবাই জেনে যাবে, শেষ হাসি কে হাসতে চলেছেন—মোদি না দিদি। রাত পোহালেই ঘটতে চলেছে অভূতপূর্ব এই নির্বাচনী নাটকের যবনিকা উত্তোলন। স্বাধীনতা–উত্তর পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য এমন ক্ষুরধার প্রতিযোগিতা দেখা যায়নি। এমন ‘কী হয়, কী হয়’ উত্তেজনাও অদৃশ্যপূর্ব। সংগত কারণেই ভারতের দেশের নজর নিবদ্ধ পশ্চিমবঙ্গে।

শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, চিটাগুড়ে মাছির আটকে পড়ার মতো এপার বাংলার দিকে আটকে রয়েছে বাংলাদেশের নজরও। সীমান্তপারে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলে দুই দেশের সম্পর্কের রসায়নে কী কী বদল ঘটতে পারে, সে চিন্তাও আচ্ছন্ন রেখেছে পদ্মাপারের মানুষকে। নইলে চার দিন ধরে ‘কী হতে চলেছে’, ‘কী হবে’—এই প্রশ্ন দূরাভাষে অবিরাম ভেসে আসত না।

স্থানীয় সময় আগামীকাল সোমবার সকাল ৮টায় শুরু হবে ভোট গণনা। প্রথমে গোনা হবে পোস্টাল ব্যালট। তারপর খোলা হবে ইভিএম। ২০২১ সালে রাজ্যের জেলায় জেলায় মোট ১০৮টি কেন্দ্রে গণনা হয়েছিল। এবার নির্বাচন কমিশন প্রথমে গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা কমিয়ে ৮৭ করে। পরে আরও ১০টি কেন্দ্র কমিয়ে সংখ্যাটি ৭৭ করা হয়েছে। কলকাতায় নির্বাচনী কেন্দ্র রয়েছে ১১টি। সেগুলোর গণনা হবে পাঁচটি কেন্দ্রে। রায়বন্দী ইভিএমগুলো ভোট শেষ হওয়ার পর প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে ‘সিল’ করা হয়েছে। রাখা হয়েছে বিভিন্ন এলাকায় স্ট্রং রুমে। চার দিন ধরে যুযুধান দুই রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির নেতা–কর্মীরা পালা করে স্ট্রং রুম পাহারা দিচ্ছেন। পাহারায় আছে কেন্দ্রীয় বাহিনীও। গণনা নিয়ে দুই পক্ষই কর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে রেখেছে। গত শনিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে গণনাকেন্দ্রে কর্মীদের ইতিকর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, শাসকের এজেন্টরা ভোট লুটের চেষ্টায় খামতি রাখবেন না। কিন্তু একটি ভোটও চুরি হতে দেওয়া যাবে না।

গণনাকেন্দ্রে থাকা দলীয় এজেন্ট ও কর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া ছাড়াও গণনাকেন্দ্রের বাইরের তৎপরতা কেমন হবে, তা জানিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রতিটি গণনাকেন্দ্রে টেনে দেওয়া গণ্ডির বাইরে থাকতে বলা হয়েছে পাঁচ হাজার দলীয় কর্মীকে। এই কর্মীদের মধ্যে থাকবেন দলের ছাত্র, যুব, মহিলা ও ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যরা। গণনাকেন্দ্রের কাছের সব পার্টি অফিস সকাল থেকেই খুলে রাখতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, সকাল থেকেই যেন পার্টি অফিসগুলো গমগম করে। রোববার সকাল থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস লাগাতার খোলা থাকবে। কোথাও কোনো গড়বড় দেখলেই তা সেই অফিসে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তৎপরতা বিজেপিতেও। রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব ‘পরিবর্তনের হাওয়া’ অনুভব করে কর্মীদের ‘সব রকমভাবে’ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। তৃণমূলের চেয়ে বিজেপির তৎপরতা যদিও কিছুটা কম; তারা জানে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটপর্ব শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করার দায়িত্ব নিয়েছে। গণনা–সম্পর্কিত কারচুপির শঙ্কাও তাদের কম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেপির এক রাজ্য নেতা গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এতকাল রাজ্যে যেভাবে ভোট হয়েছে, সবাই বলছে, এবারের ভোট তা থেকে আলাদা। এই প্রথম নির্বাচন কমিশন নির্বিঘ্নে ভোটদান নিশ্চিত করতে পেরেছে। গণনায় তার প্রতিফলন ঘটবে। মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে নিশ্চিন্তে রায় দিতে পেরেছে।’ ওই নেতা বলেন, ‘দলীয় কর্মীদের বলা হয়েছে, তাঁরা যেন রোববার সারাটা দিন পরিবর্তন কামনা করে মন্দিরে মন্দিরে প্রার্থনা করেন।’

স্ট্রং রুম পাহারা দিচ্ছেন বিজেপির নেতা–কর্মীরাও। এই পাহারার কাজে তাঁরা প্রধান দায়িত্ব দিয়েছেন দলের নারী কর্মীদের। তৃণমূলের তুলনায় বিজেপির ভোট–শিক্ষিত কর্মী ও বুথ এজেন্টদের সংখ্যা কম। অভিজ্ঞতাও কম। কিন্তু এবার সেই ঘাটতি পূরণে তারা তৎপর। কয় দিন ধরে তারা এই বিষয়ে বিশেষ শিক্ষাশিবিরের আয়োজন করেছে। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় করা হয়েছে কর্মশালাও। বিজেপির আশঙ্কা, গণনাকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেস জায়গায় জায়গায় গোলমাল করতে পারে। তা ঠেকাতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে কর্মীদের ‘সমন্বয় রাখতে’ বলা হয়েছে।

চার দিন ধরে রাজ্য তো বটেই, দেশেরও সর্বত্র একটাই জল্পনা, শেষ পর্যন্ত বাজি কে মারবেন। নরেন্দ্র মোদি, নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নিশ্চিত পূর্বাভাস বা ভবিষ্যদ্বাণী এতটাই অনিশ্চিত যে ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া’ ও ‘সি ভোটার’–এর মতো পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত নির্বাচনী সমীক্ষক সংস্থা সম্ভাব্য জয়ী কে হবেন, সেই ইঙ্গিত দেয়নি। বুথফেরত সমীক্ষার পর সবাই মোটামুটিভাবে একমত, আসামে বিজেপি, কেরলায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে–কংগ্রেস জোট এবং পদুচেরিতে এনআর কংগ্রেস–বিজেপি জোট ক্ষমতায় আসছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সমীক্ষক সংস্থা বিজেপিকে এগিয়ে রাখলেও ফল নিয়ে সন্দেহ ও সংশয় প্রবল। এসআইআর কাদের পক্ষে যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের হয়রানি বাঙালির জাত্যভিমানে ঘা দিয়েছে কি না, তৃণমূল কংগ্রেস এই লড়াই ‘বাঙালি বনাম বহিরাগত’–তে পরিণত করতে পেরেছে কি না, পরিবর্তনের হাওয়া শহরাঞ্চলের মতো গ্রাম ও মফস্‌সলেও বহমান কি না, সংখ্যালঘু মুসলমান ও নারীরা এবারেও দৃঢ়ভাবে ‘দিদি’র পক্ষে কতটা দাঁড়াচ্ছে, বঙ্গবাসী সত্যিই তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে বীতশ্রদ্ধ কি না—এ প্রশ্নগুলোর নিশ্চিত জবাব কারও কাছে নেই।

ভোটদানের হার এত বেশি হওয়ার মানেই–বা কী, তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তির মোকাবিলা নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সাহায্যে বিজেপি গোটা রাজ্যে সফলভাবে করতে পারল কি না, তা নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে সাধারণ মানুষ মোদির চেয়ে দিদির ওপর এবারও ভরসা রাখল কি না, সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। ফলে শিক্ষিত মধ্য ও উচ্চবিত্ত হিন্দু বাঙালি পরিবর্তনের পক্ষে নরেন্দ্র মোদির হাত ধরলেও সেই হাওয়া যে গোটা রাজ্যে সমভাবে বহমান, নিশ্চিতভাবে তা কেউ বলতে পারছে না। ফলে উত্তেজনা এখনো টান টান। মোদি ও দিদির মধ্যে পেন্ডুলাম দুলেই চলেছে।

দোলাচলের আসল কথাটা পরিচিত সমীক্ষক যশোবন্ত দেশমুখ কবুল করেছেন। ‘সি ভোটার’–এর কর্ণধার বলেছেন, ‘একদিকে দেখছি সরকারবিরোধী মনোভাবের প্রাবল্য, অন্যদিকে দেখছি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপুল জনপ্রিয়তা। যে রাজ্যে মোট ভোটারের এক–তৃতীয়াংশ সংখ্যালঘু মুসলমান, যাঁরা এখনো বিজেপির প্রতিস্পর্ধী হিসেবে দিদিকেই আঁকড়ে রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে নারীদের সমর্থন অটুট থাকলে পরিবর্তনের হাওয়া কি ওলট–পালট করে দিতে পারবে? এ ধাঁধার উত্তর মিলবে আগামীকাল দ্বিপ্রহরেই। ততক্ষণ টান টান উত্তেজনাতেই কাটাতে হবে সবাইকে।

সর্বশেষ