৩রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান: ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাব ও ট্রাম্পের সংশয়

তেহরান ও ওয়াশিংটন — দীর্ঘ ৬৫ দিন ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরান ১৪ দফার একটি নতুন শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং দুই পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস শান্তি প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তু
​তেহরান চাইছে সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পাঠানো এই ১৪ দফা প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
​নিরাপত্তার নিশ্চয়তা: ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কোনো হামলা হবে না—এমন আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি।
​সেনা প্রত্যাহার: ইরানের চারপাশ থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া।
​সম্পদ ও নিষেধাজ্ঞা: যুক্তরাষ্ট্রে আটকে পড়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
​ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: এনপিটি (NPT) স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় রাখা।

​হরমুজ প্রণালী: প্রণালীতে নৌ-চলাচলের জন্য একটি ‘নতুন মেকানিজম’ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করা।
​ক্ষতিপূরণ ও আঞ্চলিক শান্তি: যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ অর্থ প্রদান এবং লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে শত্রুতা বন্ধ করা।
​ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া: “বল এখন যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে”
​ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, তারা প্রস্তাব দিয়ে দিয়েছেন এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রকে বেছে নিতে হবে তারা কূটনীতি নাকি সংঘাতের পথে হাঁটবে।
​ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন। তবে তিনি কিছুটা কঠোর সুরেই বলেন:
​”যদি তারা (ইরান) কোনো খারাপ কিছু করে, তবে পুনরায় হামলা চালানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।”

​ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন যে, এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হওয়া কঠিন, কারণ তার মতে, গত ৪৭ বছরে ইরান বিশ্বের যে ক্ষতি করেছে তার বিপরীতে তারা এখনো যথেষ্ট ‘মূল্য’ দেয়নি। ট্রাম্পের কাছে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করা একটি “রেড লাইন” বা চূড়ান্ত শর্ত।
​বর্তমান পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
​গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত:
​নৌ-অবরোধ: ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারি রেখেছে, যাকে ট্রাম্প “খুবই লাভজনক ব্যবসা” বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে ইরান একে “জলদস্যুতা” বলে আখ্যা দিয়েছে।
​তেলবাজারের অস্থিরতা: হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় এবং মার্কিন অবরোধের কারণে তেলের দাম আকাশচুম্বী। যুদ্ধের আগে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৬৫ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা ১১১.২৯ ডলারে পৌঁছেছে।
​সামরিক সতর্কাবস্থা: ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) জানিয়েছে, তারা যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু করার জন্য “ফুল স্ট্যান্ডবাই” মোডে রয়েছে।
​বিশ্লেষকদের মত
​জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, ইরান তাদের প্রস্তাবে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অবরোধ বন্ধের পূর্বশর্ত শিথিল করার মাধ্যমে। তবে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে দুই পক্ষ এখনো একে অপরের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। সোফান সেন্টারের কেনেথ কাটজম্যানের মতে, মূল সমস্যাটি হলো দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে চরম আস্থার অভাব, যা যেকোনো সময় শান্তি আলোচনাকে ভেস্তে দিতে পারে।
​এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের এই ১৪ দফাকে কোনো সমঝোতার ভিত্তিতে নিয়ে আসে নাকি মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

সর্বশেষ