ঘুষ-দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স: সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সচিব সভার ২৩ দফা কঠোর নির্দেশনা
সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে এক গুচ্ছ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। দুর্নীতির দাগ লেগে থাকা কর্মকর্তা- কর্মচারীদের খুঁজে বের করতে প্রতিটি দপ্তরে নিজস্ব পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠনসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়মিত বিদেশ গমনে লাগাম টানার সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সচিব সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়। সভাটি মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবং সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবেরা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে সম্প্রতি গৃহীত নির্দেশনাসমূহ সরকারের সকল দপ্তর ও সংস্থায় দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে পাঠিয়ে অবিলম্বে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি রোধে তদন্ত কমিটি ও যথেচ্ছ বিদেশ যাত্রায় কড়াকড়ি
যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে একাধিক কর্মস্থলে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও মনিটরিং কমিটি গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা মিললে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিভাগীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। একই সাথে, সরকারি বাজেটে বারবার একই কর্মকর্তার অযৌক্তিক বিদেশ ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করার নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে ডিজিটাল হাজিরা ও তদবির সংস্কৃতি বন্ধ
কর্মক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিতে প্রতিটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে বায়োমেট্রিক বা ডিজিটাল হাজিরা মেশিন চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সারা দেশের সকল সরকারি দপ্তরের এই হাজিরার চিত্র কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিংয়ের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে একটি ‘একক অনলাইন ড্যাশবোর্ড’ গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনে নিয়মবহির্ভূত চাপ সৃষ্টি বন্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। চাকরি পদোন্নতি, বদলি বা পদায়নের বিষয়ে কোনো কর্মচারী তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। কর্মচারীর ব্যক্তিগত সার্ভিস বই বা ডোসিয়ারে উক্ত তদবিরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত রাখা হবে।
সব দপ্তরে সৌরবিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়
চলতি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকারি সকল ভবন, অধিদপ্তর ও অধীনস্থ দপ্তরের ছাদে ‘সোলার প্যানেল’ স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের অগ্রগতি নিয়ে প্রতি দুই মাস অন্তর বিদ্যুৎ বিভাগকে লিখিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। এছাড়া দপ্তরগুলোতে অপ্রয়োজনীয় আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধনের তাগিদ দেওয়া হয়।
অপ্রয়োজনীয় পদ বাতিল ও প্রশাসনিক গতিশীলতা
প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত বা অপ্রয়োজনীয় পদগুলো বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নিতে সচিবদের বলা হয়েছে। তবে শূন্যপদে যোগ্য লোক নিয়োগের প্রক্রিয়া সচল রাখার পাশাপশি সকল দপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) আধুনিকায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতি তিন মাস অন্তর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এর হালনাগাদ তথ্য পাঠাতে হবে। সরকারি কাজ দ্রুত নিষ্পত্তিতে ডি-নথি (ডিজিটাল ফাইল) ও সিক্রেট সার্ভিস গাইডলাইন মেনে নথি ব্যবস্থাপনার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনি বিরোধ ও অন্যান্য নির্দেশনা
এক সরকারি প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরের প্রবণতা পরিহার করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আন্তঃসংস্থা বা আন্তঃমন্ত্রণালয় সংক্রান্ত জমি ও অন্যান্য আইনি বিরোধ নিজস্ব আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে মাঠ পর্যায়ে সরকারি জমিতে নামজারি ও গেজেট প্রকাশ নিশ্চিত করতে বলা হয়।
ক্রয় সংক্রান্ত প্রস্তাবে পিপিআর অনুসরণ নিশ্চিতকরণ, অর্থের বরাদ্দ ব্যতিরেকে কোনো ক্রয় প্রস্তাব না পাঠানো, উপজেলা প্রশাসন থেকে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় হয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং প্রকল্প মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে সচিবদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।