বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট: উচ্চমূল্যে গ্যাসের বড় ভাগ ইউরোপের, এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো গভীর ঝুঁকিতে
বিশ্বজুড়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজারে তীব্র অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। স্পট মার্কেটে চড়া দামের কারণে এশিয়ার দেশগুলোতে আমদানি কমলেও শীতের আগমনকে কেন্দ্র করে বেশি দামেই বিপুল পরিমাণ গ্যাস সংগ্রহ করছে ইউরোপ। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর এশিয়ার দেশগুলোর ওপর।
পণ্যবাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, চলতি সেপ্টেম্বরে এশিয়ায় এলএনজি আমদানির পরিমাণ কমে প্রায় ২০ মিলিয়ন টনে নেমে আসতে পারে। গত মাসে কিংবা আগের বছরের একই সময়ে এই আমদানির পরিমাণ ছিল অন্তত ২২ মিলিয়ন টন। আকাশছোঁয়া দামের দরুন বছরের বাকি দিনগুলোতেও এ অঞ্চলে এলএনজির চাহিদা কম থাকার পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে শীত মৌসুমের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে চাপ বাড়ছে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর। চলতি মাসে ইউরোপ প্রায় ৮ মিলিয়ন টন এলএনজি কিনলেও অক্টোবর নাগাদ এর চাহিদা সাড়ে ১০ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, বছর শেষে ইউরোপের মোট আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১২৫ মিলিয়ন টনে।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে স্থবিরতার কারণে শীর্ষ উৎপাদক কাতার থেকে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ সামরিক তৎপরতা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম লাফিয়ে প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছে। এর পাশাপাশি ইউরোপমুখী রুশ গ্যাসের প্রধান পাইপলাইনগুলো নিষেধাজ্ঞার কবলে বন্ধ থাকায় চড়া দাম দেওয়া ছাড়া ইউরোপের সামনে বিকল্প নেই।
এর আগে ২০২২ সালে ইউক্রেন সংকটের সময়েও উচ্চমূল্যে গ্যাস মজুত করে পরবর্তীতে চাহিদার অভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছিল ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে তৎকালীন সময়ে বিকল্প রুশ পাইপলাইন আংশিক সচল থাকলেও এবার সেই সুযোগ একেবারে অনুপস্থিত।
চলতি বাজার অস্থিরতায় অবশ্য সতর্ক পথ অবলম্বন করছে চীন। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে স্থলপথের পাইপলাইন ব্যবহার করে নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখছে দেশটি। অন্যদিকে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে না পেরে এশিয়ার অনেক উন্নয়নশীল দেশ বাধ্য হয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে।
কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সরবরাহ ব্যবস্থার এই অচলাবস্থার কারণে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো, যা এসব দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতকে নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।