আদ্-দ্বীনের লাইসেন্স নিয়ে ধোঁয়াশা: অধিদপ্তরের আদেশ ‘বাতিল’, সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন ‘স্থগিত’
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স নিয়ে তৈরি হয়েছে এক চরম নাটকীয় পরিস্থিতি। একই ঘটনা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্পষ্ট সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পয়েছে। একদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রজ্ঞাপন জারি করে হাসপাতালটির লাইসেন্স ‘বাতিল’ করার কথা জানালেও, জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দাবি করেছেন, লাইসেন্স বাতিল নয়, বরং ‘স্থগিত’ করা হয়েছে।
রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
সংসদে যা বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
অধিবেশনে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স সংক্রান্ত সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন,
”অনেক সংসদ সদস্য আদ্-দ্বীনের স্বল্পমূল্যের সেবা ও ডায়ালিসিস নিয়ে কথা বলেছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন—মাথাব্যথার জন্য কি মাথা কেটে ফেলা যায়? আমি বলব, মাথা কাটা যায় না। তবে যারা মাথা কাটে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমরা মাথা কাটতে বলিনি, শুধু লাইসেন্স স্থগিত করেছি।”
সংসদে সেই ভয়াল রাতের বর্ণনা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, গত ২৭ মে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বন্ধ থাকা এবং কোনো জানালা ও অক্সিজেন না থাকায় ১৬-১৭ জন মানুষের মাঝে হাইপার-ক্যাপনিয়ায় (রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া) আক্রান্ত হয়ে ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ৬টি নবজাতক ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এটি স্পষ্ট অবহেলা। হাসপাতালকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতেই মালিকপক্ষের একগুঁয়েমির কারণে পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন করে তার স্ত্রীকে চিফ এক্সিকিউটিভ করা হয়েছে। তিনি এই বিষয়টি নিয়ে দলীয়করণ না করারও আহ্বান জানান।
অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে ভিন্ন চিত্র
মন্ত্রীর এই ‘স্থগিত’ দাবির বিপরীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত ১১ জুন অধিদপ্তর থেকে জারি করা এক আদেশে স্পষ্টভাবে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স ‘বাতিল’ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এমনকি পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের বিকল্প সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকার ৬টি হাসপাতালকে দায়িত্ব দিয়ে যে জরুরি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, সেখানেও ‘লাইসেন্স বাতিল’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে।
কেন এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি অক্সিজেনের অভাব ও কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলাকে দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত সময় চেয়ে গত ৯ জুন যে লিখিত জবাব দাখিল করে, তা সন্তোষজনক মনে করেনি অধিদপ্তর। ফলে ‘বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’ এর ১১(২)(খ) ধারা অনুযায়ী হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়। অবশ্য আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী, এই আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করার সুযোগ রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।
একই ঘটনা নিয়ে সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ—অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের দুই রকম বক্তব্যে সাধারণ মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা খাতের অংশীজনদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।