১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

৮ বছরেও শেষ হয়নি নরসিংদী জেলা হাসপাতালের বর্ধিত ভবনের নির্মাণকাজ

 

দীর্ঘ ৮ বছরেও শেষ হয়নি নির্মাণাধীন নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের আরও ১৫০ শয্যা বর্ধিতাংশের নতুন ভবনের কাজ। এতে করে উন্নত স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত নরসিংদীবাসী। বর্ধিতাংশের নতুন ভবনের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসা। তবে এখনো ভবনের রঙ, বেসিন, বাথরুমের কমোড, লিফট লাগানোসহ অনেক কাজ অসমাপ্ত রয়েছে সেই সঙ্গে রয়েছে নিরাপত্তার অভাব। 

জানা গেছে, নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নিত করার জন্য নব-নির্মিত ১২ তলা বিশিষ্ট ভবনের ৮ম তলা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ চলমান। হাসপাতালটির ৯ম তলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার নির্মাণের কথা থাকলেও যেহেতু ৯ম তলা নির্মিত হয়নি তাই ৮ম তলায় ডায়ালাইসিস সেন্টর স্থাপনের জন্য স্থাপত্য অধিদপ্তরের অনুমোদনক্রমে ডায়ালাইসিস সেন্টার নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনের কাজ সমাপ্ত হলেও হাসপাতালের লিফট স্থাপনসহ আনুষাঙ্গিক অনেক কাজ এখনো অসম্পন্ন রয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ৮তলা ভবনের নীচতলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে ভবনের দু’পাশে দুটি করে চারটি লিফটের ব্যবস্থা রয়েছে । তবে এখনো লিফটের কাজ অসম্পন্ন। এছাড়াও ৮ম তলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার নির্মাণ কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। সেখানে ইটের গাথুনি, আস্তর ও টাইলস এবং দরজা লাগানো কাজ করছেন তারা।

এসময় কর্মরত নির্মাণ শ্রমিক আমিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ৮ম তলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার ইউনিটে প্রায় এক মাস যাবৎ কাজ করছেন তিনি। ইটের গাথুনি শেষ হয়েছে, আস্তরের কাজ চলমান, তারপরই টাইলস লাগানো হবে। এছাড়া দরজার ফ্রেম লাগানো হচ্ছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই শেষ হবে দরজার কাজ, পরে রং করা হবে। আশা করা যাচ্ছে আগামী এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে।

নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নিতকরণ প্রকল্পের নতুন ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু করা হয় ২০১৮ সালে। ৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বাজাটের এই কাজটি পায় এমএন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ১৩ তলা ফাউন্ডেশনের নির্মাণার্ধীন আটতলা ভবনের প্রথম তলায় থাকবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, রিসেপশন ও রান্নাঘর। দ্বিতীয় তলাজুড়ে থাকবে আউটডোরের ১৮ টি কক্ষ, তৃতীয় তলায় থাকবে রেডিও ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি। চতুর্থ তলায় অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও সিসিইউ। পঞ্চম তলায় স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগ এবং ২৮ শয্যা মহিলা ওয়ার্ড। ষষ্ঠ তলায় প্রশাসনিক অফিস (এ্যাডমিন ব্লক) ও ক্যান্টিন। সপ্তম তলায় থাকবে ৫৮টি ওয়ার্ড। এছাড়া অষ্টম তলায় থাকবে ডায়ালসিস সেন্টার ও আইসোলেশন ইউনিট।

এ ব্যাপারে এমএন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এর ম্যানেজার কামাল উদ্দিন বলেন, আমাদেরকে যেটুকু কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল সেটুকু কাজ সম্পন্ন করে আমরা গণপূর্ত বিভাগকে ২০২২ সালেই বুঝিয়ে দিয়েছি। এখন আমাদের কোনো কাজ চলমান নেই।

নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসা জানান, নতুন ভবনের নির্মাণকাজ এখন পর্যন্ত ৯০ ভাগ সমাপ্ত হয়েছে। তবে চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভবনের ভেতরে বেসিন, বাথরুমের কমোড, লাইট, ফ্যান, লিফট ইত্যাদি লাগানো হয়নি। এছাড়া রঙ করার কাজ বাকি রয়েছে। তবে এখনো যে স্থানে ইটের গাথুনি, আস্তর, টাইলস ও দরজা লাগানোর কাজ চলমান রয়েছে তা ২০২৫ সালের জুলাই মাসের দিকে নতুন টেন্ডারের কাজ চলমান। এটা মূল হাসপাতালের প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এটা আলাদা একটি প্রকল্প, যার ব্যয় ২০ লাখ টাকা। ৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা টেন্ডারের কাজের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তিনি আরও জানান, ভবনটি বুঝে নিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা ভবন বুঝে নেওয়ার জন্য তারিখ জানালে আমরা এক মাসের মধ্যে বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করে দেব।

নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান জানান, শতভাগ কাজ শেষ না করেই কেন আমাকে গণপূর্ত বিভাগ ভবন বুঝে নেওয়ার জন্য চিঠি দিচ্ছে তা আমি বুঝতে পারছি না। ভবনটির শতভাগ কাজ সম্পন্ন হলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক ভবনটি বুঝে নেওয়া হবে। এছাড়া ভবনটির কাজ সম্পন্নের বিষয়ে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিদর্শন কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এখনো শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি কাজ চলমান রয়েছে।

তিনি আরও জানান, নবনির্মিত ভবনে আইসিও, সিসিও, ডায়ালাইসিস সেন্টার, বিশেষায়িত সেবা, চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চালু করার জন্য জনবল, লজিস্টিক, আসবাবপত্র, নিরাপত্তারক্ষী ও প্রশাসনিক অনুমোদন প্রাপ্তির জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কাজ চলমান রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই জনবল নিয়োগ, আসবাবপত্র, লজিস্টিক সাপোর্ট পাওয়া গেলে স্বাস্থ্য সেবা চলু করতে পারবো বলে আশা করছি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হলধর দাস বলেন, মানুষের চিকিৎসা সেবা বৃদ্ধির জন্য নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নিতকরণের জন্য ৮ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে এখনো লোকবল নিয়োগ হলো না, যন্ত্রপাতিও এলো না। তাই যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালটি চালু করতে যা যা প্রয়োজন, তা করার দাবি জানাচ্ছি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নরসিংদী জেলা হাসপাতালে সেবা সম্প্রসারিত হলে ঢাকা মেডিকেল বা পঙ্গু হাসপাতালে রোগীর চাপ কমপক্ষে ২০ শতাংশ কমবে। নরসিংদী ও পার্শ্ববর্তী জেলার রোগীদের ছোটখাটো অস্ত্রোপচার বা নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য ঢাকায় দৌড়াতে হবে না। দ্রুত হাসপাতালটি চালুর ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছে নরসিংদী জেলাবাসী।

 

সর্বশেষ