ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাটকীয় মেরুকরণ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হাত মিলিয়েছেন দেশটির দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ। গঠন করেছেন ‘টুগেদার’নামের নতুন এক রাজনৈতিক জোট।
আগামী অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহুবিরোধী এই শিবিরের লক্ষ্য একটাই—নেতানিয়াহুকে হটিয়ে তেল আবিবের মসনদ দখল করা।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, নেতানিয়াহুর বিদায় আর নতুন কোনো নেতৃত্ব কি আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের নজিরবিহীন একাকীত্ব ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে পারবে?
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তরটি মোটেও ইতিবাচক নয়। কারণ, নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী নীতি আর ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো বর্বরতার প্রশ্নে বেনেট কিংবা লাপিদ—কারও অবস্থানেরই কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই।
একই মুদ্রার ওপিঠ
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জোটে আসা এই দুই নেতার মূল বাজি হলো—বিশ্বজুড়ে বর্তমান ঘৃণা ও ক্ষোভের কেন্দ্রে কেবল নেতানিয়াহুই রয়েছেন, ইসরায়েল রাষ্ট্র নয়। তারা মনে করছেন, নেতানিয়াহুকে সরাতে পারলে বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি আবার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গাজা, লেবানন কিংবা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নীতিতে বেনেট বা লাপিদের কোনো ভিন্ন মত নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা নেতানিয়াহুর চেয়েও বেশি উগ্র ও আক্রমণাত্মক। গাজায় চলমান গণহত্যা, যাতে ইতোমধ্যে ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, সেটির প্রকাশ্য সাফাই গেয়েছেন উগ্র ডানপন্থী নেতা নাফতালি বেনেট। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে ‘বেসামরিক অবকাঠামোয় মিশে থাকা’ গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যা দিয়ে গাজার ওপর ইসরায়েলের নির্বিচার হামলাকে বারবার বৈধতা দিয়েছেন তিনি।
ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিংকাস আল-জাজিরাকে বলেন, “নীতিগত দিক থেকে তারা মূলত একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন কে কতটা বেশি যুদ্ধংদেহী ও আক্রমণাত্মক হতে পারেন। লেবানন, হরমুজ প্রণালী কিংবা ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারা কেউই কোনো নতুন বা শান্তির বার্তা দিচ্ছেন না।”
বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েলের নজিরবিহীন বিচ্ছিন্নতা
নেতানিয়াহুর শাসনামলে আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধের মুখোমুখি হওয়া থেকে শুরু করে জাতিসংঘের কমিশন কর্তৃক গাজায় গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হওয়া—সব মিলিয়ে ইসরায়েল এখন ইতিহাসের সবচেয়ে একা। ইউরোপের স্পেইন, নরওয়ে এবং আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ভেতর থেকেও ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের চাপ বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ এখন ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন রাজনীতির অন্ধ সমর্থনে ক্ষুব্ধ। হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর তথাকথিত ‘ব্রোম্যান্স’ থাকলেও ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু পোস্ট দুই দেশের ভেতরের ফাটলকে স্পষ্ট করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, “ট্রাম্প কখনো পরাজিতদের পছন্দ করেন না।” ফলে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ভরাডুবির আভাস পেলে ট্রাম্পও বেনেট-লাপিদ জোটের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
নেতৃত্ব বদল কি কেবলই এক সাময়িক স্বস্তি?
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস
(ইসিএফআর)-এর পলিসি ফেলো বেথ ওপেনহেইম মনে করেন, ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য এবং অত্যাধুনিক স্পাইওয়্যার প্রযুক্তির ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর যে নির্ভরতা রয়েছে, তার কারণে পশ্চিমা সরকারগুলো এখনই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চরম কোনো পদক্ষেপ নিতে চাচ্ছে না। ফলে নেতানিয়াহুর পরিবর্তে একজন ‘মার্জিত’ বা ‘ভদ্র’ নতুন নেতা এলে পশ্চিমা দেশগুলো হয়তো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করার (রিসেট) একটি সুযোগ খুঁজবে।
তবে ওপেনহেইম সতর্ক করে বলেন, “নতুন সরকার এলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিরোধিতার প্রশ্নে ইসরায়েলের প্রায় সব ইহুদি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এক ধরনের জাতীয় ঐক্য রয়েছে। ফলে ইসরায়েলের উগ্র নিরাপত্তা নীতির যদি স্থায়ী পরিবর্তন না হয়, তবে কেবল নেতৃত্ব বদলে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের এই আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ঠেকানো সম্ভব নয়।”
পশ্চিমা দেশগুলোর সামনে এখন বড় পরীক্ষা—তারা কি কেবল নেতানিয়াহুর বিদায়কেই ইসরায়েলের ‘শুদ্ধিকরণ’ হিসেবে মেনে নিয়ে আগের মতো সব অপরাধ পার পেয়ে যেতে দেবে, নাকি ইসরায়েলকে স্পষ্ট বার্তা দেবে যে, ব্যক্তি নেতানিয়াহু নয়, ফিলিস্তিনিদের ওপর বছরের পর বছর ধরে চালানো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও দখলদারিত্ব বন্ধ না করলে এই বিশ্বজোড়া একাকীত্ব ঘুচবে না।