২০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ৩রা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

মহানবীর (সা.) হাদিসে যেভাবে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে

আকাশ আজ তার নীলিমা হারিয়েছে, বাতাসের প্রতিটি নিঃশ্বাসে এখন বিষাক্ত কার্বনের দহন। তপ্ত বৈশাখে যখন রাজপথ গলে যায় কিংবা অকাল বন্যায় যখন জনপদ ভেসে যায়, তখন আমরা শুধু প্রকৃতির রুদ্ররূপ নিয়ে হাহাকার করি। কিন্তু এই মহাবিপর্যয়ের মূলে রয়েছে মানুষের সীমাহীন লিপ্সা আর প্রকৃতির ওপর চালানো দীর্ঘস্থায়ী নিষ্ঠুরতা।

আধুনিক বিজ্ঞান যখন ‘সাস্টেইনেবিলিটি’ বা টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞায় দিশেহারা, তখন আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে মরুর তপ্ত বালুতে দাঁড়িয়ে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিখিয়ে গেছেন প্রকৃতির সাথে পরম সখ্যতায় বেঁচে থাকার এক কালজয়ী আধ্যাত্মিক ও বিজ্ঞানসম্মত জীবনদর্শন।

. আমানতদারির মহান দর্শন

ইসলামের তাত্ত্বিক কাঠামোতে মানুষ এই পৃথিবীর অধিপতি নয়, বরং ‘খলিফা’ বা বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। পবিত্র কোরআনের মূল ভাষ্য হলো—এই ধরিত্রী ও তার প্রতিটি প্রাণকোষ আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে গচ্ছিত এক পবিত্র আমানত।

নবীজি (সা.) আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে দিয়ে বলেছিলেন, দুনিয়া সুমিষ্ট ও সুদৃশ্যময় বস্তু। আল্লাহ তায়ালা এখানে তোমাদের প্রতিনিধি বানিয়েছেন। তিনি দেখবেন, তোমরা কেমন আমল কর। সুতরাং তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো দুনিয়া সম্পর্কে এবং তাকওয়া অবলম্বন করো নারীদের সম্পর্কে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৫৮)।

আবদুল্লাহ ইবনে হাবাশি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি (বিনা প্রয়োজনে) কোনো কুলবৃক্ষ কাটবে, আল্লাহ তাকে মাথা উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।

ইমাম আবু দাউদকে এই হাদিসের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এটি একটি সংক্ষিপ্ত হাদিস। এর অর্থ হলো—যদি কেউ বিনা প্রয়োজনে, অন্যায়ভাবে এবং কোনো অধিকার ছাড়াই এমন কোনো গাছ কাটে যার ছায়ায় পথিক বা পশুপাখি আশ্রয় নেয়, তবে আল্লাহ তাকে মাথা উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৫২৩৯)

অর্থাৎ, একটি ডাল ভাঙা কিংবা জলাশয় দূষিত করা শুধু পরিবেশগত স্খলন নয়, বরং এটি খোদ আল্লাহর সাথে করা বিশ্বাসের অবমাননা।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় রাস্তার ওপর একটি কাঁটাযুক্ত ডাল দেখতে পেল এবং সেটিকে সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার এই কাজে অত্যন্ত খুশি হলেন (শুকরিয়া জানালেন) এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৪০, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৪)

. ক্ষতিহীন পৃথিবী: ইকোজাস্টিসের মূলমন্ত্র

পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ইসলামের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংক্ষিপ্ত আইনি ভিত্তি হলো নবীজির (সা.) সেই যুগান্তকারী নীতি— ‘ক্ষতি করো না এবং ক্ষতির বিনিময়েও ক্ষতি করো না।’ (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৪০)।

এই দর্শনেই লুকিয়ে আছে আধুনিক বিশ্বের ‘প্রিকশনারি প্রিন্সিপল’ বা সতর্কতামূলক নীতি। আপনি যখন ব্যক্তিগত মুনাফার লোভে পাহাড় কাটছেন বা নদীতে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলছেন, তখন আপনি আসলে একটি পুরো ইকোসিস্টেমের অধিকার হরণ করছেন।

নবীজি (সা.) কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করবে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন। আর যে ব্যক্তি অন্যের প্রতি কঠোর হবে, আল্লাহ তার প্রতি কঠোর হবেন।’ (আস-সুনান আল-কুবরা, হাদিস : ১১০৭০)।

বর্তমানের এই চরম জলবায়ু বিপর্যয় কি তবে প্রকৃতির ওপর আমাদের করা দীর্ঘ জুলুমেরই এক ভয়াবহ প্রতিদান?

. বনায়ন: এক অন্তহীন ইবাদতের নাম

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে বৃক্ষরোপণের চেয়ে বড় কোনো প্রতিষেধক নেই। নবীজি (সা.) বৃক্ষরোপণকে শুধু বাগান করা নয়, বরং ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা প্রবহমান দান হিসেবে অভিহিত করেছেন। হাদিসে বর্ণিত তার একটি বাণী বর্তমান বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। যেখানে তিনি বলেছেন—

আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যদি তোমাদের কারো হাতের নাগালে একটি ছোট চারাগাছ থাকে এবং ঠিক সেই মুহূর্তে কিয়ামত শুরু হয়ে যায়, তবুও সে যেন গাছটি রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২৪৯১)

আরেক হাদিসে আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সাতটি কাজের সওয়াব একজন বান্দার মৃত্যুর পর তার কবরে থাকা অবস্থায়ও অব্যাহত থাকে;  ১. যে ব্যক্তি জ্ঞান দান করেছে, ২.যে ব্যক্তি খাল বা নালা খনন করেছে, ৩. যে ব্যক্তি কূপ খনন করেছে, ৪. যে ব্যক্তি খেজুর গাছ (বা যেকোনো গাছ) রোপণ করেছে, ৫. যে ব্যক্তি মসজিদ নির্মাণ করেছে, ৬.যে ব্যক্তি পবিত্র কোরআনের পাণ্ডুলিপি রেখে গেছে, ৭. যে ব্যক্তি এমন সুসন্তান রেখে গেছে যে তার মৃত্যুর পর তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে।’ (মুসনাদ আল-বাজ্জার, হাদিস : ২৭৭৩)

অন্য হাদিসে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ লাগায় অথবা ফসল ফলায়, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ বা চারণশীল পশু আহার করে—তবে সেটি তার জন্য সদকা (দান) হিসেবে গণ্য হবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৫৩)

আজ যখন আমরা গগনচুম্বী অট্টালিকা গড়তে গিয়ে নির্বিচারে অরণ্য সংহার করছি, তখন নবীজির এই শিক্ষা আমাদের নির্দেশ দেয় যে—পৃথিবীর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সবুজের পতাকা উড্ডীন রাখা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।

. মিতব্যয় ভোগবাদের অবসান

বর্তমান পরিবেশগত সংকটের নাভিমূলে রয়েছে মানুষের অদম্য ভোগবাদ। আধুনিক ভোগবাদী সমাজ আমাদের শুধু ‘ব্যয়’ আর ‘অপচয়’ করতে প্ররোচিত করে।

কিন্তু নবীজি (সা.)-এর জীবনদর্শন ছিল ‘মিনিমালিজম’ বা ন্যূনতম সম্পদে তুষ্টি। আবু উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন নবীজি (সা.)-এর সাহাবীগণ তার কাছে দুনিয়া ও তার চাকচিক্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ না? তোমরা কি শুনতে পাচ্ছ না? নিশ্চয়ই সাদামাটা জীবনযাপন (সাদা জীবন) ইমানের অংশ, সাদামাটা জীবনযাপন ইমানের অংশ।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৪১৬১)

তিনি জীবনধারণের জন্য চারটি মৌলিক চাহিদার বাইরে অতিরিক্ত বিলাসিতাকে প্রকৃতির ওপর চাপ হিসেবে দেখতেন। মিকদাম বিন মাদীকারিব (রা.) থেকে বর্ণিত,  আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘মানুষ তার পেটের চেয়ে মন্দ আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্য মানুষের জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট। তবে যদি তাকে পেট পূর্ণ করতেই হয়, তবে সে যেন তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের (বাতাস) জন্য রাখে।’ (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪৭৪)

ইবনে আব্বাস (রা.) ইবনে যুবায়ের (রা.)-কে বললেন,  আমি নবীজি (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘সেই ব্যক্তি (প্রকৃত) মুমিন নয়, যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী পাশে ক্ষুধার্ত থাকে।’ (আল-আদাব আল-মুফরাদ, হাদিস : ১১২)

আমাদের চাহিদাগুলোকে যদি আমরা ‘সাত অন্ত্র’ থেকে ‘এক অন্ত্রে’ নামিয়ে আনতে পারি, তবে পৃথিবীর সম্পদের ওপর যে দানবীয় চাপ পড়ছে, তা অনেকাংশেই প্রশমিত হবে।

. নাগরিক শিষ্টাচার সুশাসন

নবীজি (সা.)-এর পরিবেশ সচেতনতা শুধু তাত্ত্বিক ছিল না, বরং তা ছিল প্রাত্যহিক জীবনের আচরণ। তিনি মানুষের চলাচলের রাস্তা, বৃক্ষের ছায়া কিংবা পানিপানের ঘাটে আবর্জনা ফেলাকে ‘অভিশপ্ত কাজ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ২৫)।
অন্যদিকে, রাস্তা থেকে একটি সাধারণ কাঁটা বা ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে দেওয়াকে তিনি জান্নাত লাভের উসিলা ও ঈমানের শাখা বলেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৪০)।

আজ আমাদের শহরের বিষাক্ত নালা আর প্লাস্টিকে ঢাকা পথঘাট কি আমাদের ঈমানের সংকটেরই সাক্ষ্য দিচ্ছে না? পরিবেশ রক্ষা মানে শুধু বড় বড় সম্মেলন নয়, বরং আপনার পায়ের কাছে পড়ে থাকা ময়লাটুকু তুলে ডাস্টবিনে রাখাও এক মহিমান্বিত ইবাদত।

. জালেমের হাত রুখে দেওয়া: আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার

নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, জালেমকে সাহায্য করার প্রকৃত উপায় হলো তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখা। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৪৪)।

আজকের দিনে যারা নদী গ্রাস করছে, যারা উন্নয়নের নামে ফুসফুসরূপী বন উজাড় করছে কিংবা বিষাক্ত ধোঁয়ায় শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করছে—তারাই সমকালের জালেম। এই পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, প্রতিবাদ করা এবং তাদের অশুভ হাতকে থামিয়ে দেওয়া শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি সরাসরি ইসলামের নির্দেশ। আমাদের নীরবতা এই ধ্বংসলীলাকে ত্বরান্বিতই করছে।

. অল্প হলেও নিয়মিত প্রচেষ্টা

পরিবেশ রক্ষা কোনো একদিনের ইভেন্ট নয় (যেমন শুধু পরিবেশ দিবসে গাছ লাগানো)। বরং প্রতিদিন প্লাস্টিক ব্যবহার সামান্য কমানো, পানির কলটি ঠিকমতো বন্ধ করা বা সামান্য আবর্জনা রাস্তায় না ফেলা—এই ছোট কিন্তু নিয়মিত কাজগুলোই বড় পরিবর্তন আনে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা ততটুকুই নেক আমল করো যতটুকু তোমাদের সাধ্যে কুলায়। কারণ, আল্লাহর কাছে সেই আমলই সবচেয়ে প্রিয় যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস :  ৪২৪০)

অনেকেই ভাবেন, ‘আমি একা কী করতে পারব?’ বা ‘বিশাল বন রক্ষার সাধ্য তো আমার নেই।’ এই হাদিসটি তাদের আশ্বস্ত করে যে, আপনার সাধ্যের মধ্যে থাকা ছোট ছোট সবুজ কাজগুলোই আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান, যদি তা আপনি নিয়মিত করেন।

পরিশেষে, পরিবেশ রক্ষা শুধু বিজ্ঞানের ফর্মুলা নয়, এটি আমাদের হৃদয়ের গহীনের বিশ্বাস। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এই পৃথিবী উত্তরাধিকার সূত্রে পাইনি, বরং আমরা এটি অনাগত সন্তানদের কাছ থেকে ‘ধার’ নিয়েছি। আমানত হিসেবে পাওয়া এই সবুজের ডালি যদি আমরা মরুভূমি বানিয়ে দিয়ে যাই, তবে বিচার দিবসে প্রকৃতির প্রতিটি ধূলিকণা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে। নবীজির (সা.) ভারসাম্যপূর্ণ ও মিতব্যয়ী জীবনদর্শন গ্রহণ করেই কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুশীতল ও নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে পারি আমরা।

সবুজ পৃথিবী গড়ার এই সংগ্রাম শুরু হোক আজ থেকেই, আমার আপনার নিজ আঙিনা থেকেই। যদি আমরা ভালো রাখি, ভালো থাকবে এই পৃথিবী, ইনশাআল্লাহ।

লেখক : জলবায়ু পরিবেশ গবেষক, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ)

 

সর্বশেষ