পুলিশে সাহসিকতা, কর্মদক্ষতা এবং সেবামূলক কাজের স্বীকৃতি হিসাবে সাধারণত ‘পুলিশ পদক’ দেওয়া হয়। অত্যন্ত সম্মানজনক এই পদকটি পাওয়ার কথা চৌকশ পুলিশ সদস্যদের। কাজের স্বীকৃতি ও কর্মস্পৃহা বাড়াতেই এই পদক দেওয়া হয়। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ পদকের মূল মানদণ্ড ছিল ‘দলীয় আনুগত্য’।
তখন পদকের মাধ্যমে আওয়ামীপন্থি পুলিশ কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হতো। ফলে অনেক যোগ্য চৌকশ কর্মকর্তা বছরের পর বছর পদক পাওয়া থেকে বঞ্চিত থেকেছেন। অপূর্ণতা নিয়েই অবসরে চলে গেছেন পেশাদার ও বিএনপি ঘরানার অনেক পুলিশ সদস্য। জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশে বড় ধাক্কা লেগেছে। আমূল পরিবর্তন এসেছে পুলিশের নেতৃত্বে। তবে পুলিশ পদকের সেই পুরোনো বিতর্ক এখনো রয়েই গেছে।
সূত্র বলছে, এ বছর পদকের জন্য মনোনীত ১০৯ জনের মধ্যে ১১ জনই আওয়ামী আমলে পদক পাওয়া। এদের মধ্যে একজন বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে দুবার পদক পেয়েছেন। ‘কথিত জঙ্গি’ দমনে সফলতার স্বীকৃতি হিসাবে পদক পাওয়া একজনও আছেন এবারের পদক প্রাপ্তির তালিকায়। প্রভাবশালী এক অতিরিক্ত আইজিপির ‘ভাগনে কোটায়’ তিনি পদক পাচ্ছেন।
এছাড়া অতীতের মতো এবারও রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশ কয়েকজনকে পদক দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাদের তেমন কোনো অর্জন না থাকলেও পুলিশের প্রভাবশালী বলয়ে থাকায় পদক পাচ্ছেন-এমন সমালোচনা খোদ পুলিশের মধ্যেই। অভিযোগ রয়েছে, গত সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক’ কাণ্ড নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা এক ডিআইজিকেও পদক দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মকর্তাকে নিয়ে পদক কমিটির বৈঠকে তীব্র মতভেদ তৈরি হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে পদকের দাবিদার যোগ্য ও দক্ষ অনেক কর্মকর্তা এবারও বঞ্চিত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ আমলে পদক পাওয়াদের বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশরি ভাগ ক্ষেত্রে ওই আমলের প্রভাবশালী বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজন ছিলেন এইসব কর্মকর্তা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের কেউ ‘জেলা কোটায়’ আবার কেউ বিএনপি পরিবারের সদস্য হওয়ায় দাপটের সঙ্গে পুলিশে বহাল তবিয়তে। কেউ আবার পুলিশের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের জেরে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। এসব কর্মকর্তাদের ফের পদকের জন্য মনোনীত করায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করে পুলিশের এসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী আমলে পদকের জন্য আবেদন করাই কঠিন ছিল। সহকারী পুলিশ সুপার থাকাকালে একটি জেলায় ডাকাত ও সন্ত্রাসী প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখায় ২০১৮ সালে বিপিএম, পিপিএম পদকের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু ডিআইজি স্যার আমার নাম কেটে দিয়েছিলেন।
পরে দেখেছি আমার ওই সফলতার জন্য তিনি নিজেই পদক পেয়ে গেছেন। পরে আর আবেদন করিনি। এবার পদকের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু আমাদের ইউনিট থেকে কয়েকজন পেলেও আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত সময়ে পুলিশ পদক নিয়ে যা হয়েছে তা নজিরবিহীন। পুলিশে এখনো যদি আগের ধারা অব্যাহত থাকে তা দুঃখজনক। সরকারের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা। প্রকৃত যোগ্য কর্মকর্তাদেরই পদক দেওয়া উচিত।
জানতে চাইলে পদক প্রদান কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘বিতর্ক যে কেউ যে কাউকে নিয়ে করতে পারে, বিতর্কের ঊর্ধ্বে কেউ নন। তবে আমরা সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। যারা আগের আমলে পদকবঞ্চিত হয়েছেন তাদের আমরা বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছি।
এখন একেবারেই পারফরম্যান্স যার নেই, তাকে আগের আমলে বঞ্চিত হওয়ার ভিত্তিতে তো পদক দিতে পারি না। একেবারেই গতানুগতিক কিছু সদস্য দেখা গেছে, তাদের সাব-ইন্সপেক্টররা (এসআই) যে কৃতিত্ব দাবি করছেন, সেটা আবার সিনিয়ররা দাবি করে তার ওপর পদক চাচ্ছেন।
আওয়ামী আমলে পদক পাওয়াদের ফের মনোনীত করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে পুলিশের অনেকে ওই সময়ও নানাভাবে ভালো কাজ করেছেন। আমরাও তো তখন চাকরিতে ছিলাম। আমরাও তো তখন কাজ করেছি।
আপনি কি আওয়ামী আমলে পদক পেয়েছিলেন-পালটা এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, ‘না। আমি না পেলেও ওই সময় যারা ভালো ভালো কাজ করেছেন আমরা তাদের বিবেচনা করেছি।’
একজন অতিরিক্ত আইজিপির ভাগনেকে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পদক দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটা তো আমরা পদক দেওয়ার সময় বুঝতে পারিনি।’
পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিটির বাইরের কোনো চাপ ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১০ জনের পদক প্রদান কমিটির সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জনের নামে অভিযোগ উঠেছে। কারোটা আবার বাদ গেছে। বাদ যাওয়ার পর আবার আমরা সেটা রিভিউ করেছি। এটা আইজিপি সাহেবকে আমরা জানিয়েছি। সোমবার সচিব মহোদয়ের সঙ্গে আমরা পুরো জিনিসগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি।
জানা গেছে, ১০ মে শুরু হতে যাচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ। ৪ দিনব্যাপী এই আয়োজনের উদ্বোধনী দিনে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম) প্রদান করা হবে। এ বছর ১০৯ সদস্যকে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মনোনীতদের হাতে পদক তুলে দেবেন বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ আমলে পদক পেয়েছিলেন যারা : এই তালিকায় ১১ জন আছেন যারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও পদক পেয়েছিলেন। তারা হলেন-বিপিএম-সেবা পদক পাওয়া ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার, পিপিএম-সেবা ও বিপিএম-সেবা পদক পাওয়া ডিএমপির ডিবি প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম, পিপিএম পদক পাওয়া সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম পদক পাওয়া ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এস্টেট, ডেভেলপমেন্ট ও আইসিটি) মোহাম্মদ ওসমান গণি, পিপিএম পদক পাওয়া র্যাব ১২-এর অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. আতিকুর রহমান মিয়া, পিপিএম-সেবা পদক পাওয়া ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান, পিপিএম-সেবা পদক পাওয়া পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এলআইসি) মো. আতিকুজ্জামান, বিপিএম পদক পাওয়া ডিএমপির গোয়েন্দা-গুলশান বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. জেহাদ হোসেন, বিপিএম পাওয়া ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের এসআই গোলাম মূর্তজা, বিপিএম-সেবা পদক পাওয়া নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানার এসআই মো. রফিক, পিপিএম পদক পাওয়া ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের কনস্টেবল মো. রিমন হোসেন। আওয়ামী লীগ আমলে গুডবুকে নাম থাকা এসব কর্মকর্তাকে বিভিন্ন কাজের স্বীকৃতি হিসাবে পদক দেওয়া হয়েছিল।
সূত্র বলছে, সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল টিমের একজন নায়েক ও দুজন কনস্টেবলকে পদকের জন্য সাইটেশন দেওয়া হয়েছিল। তাদের বাদ দিয়ে বর্তমান এক অতিরিক্তি আইজিপির আপন ভাগনে গোলাম মূর্তজাকে পদকের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। পুলিশের কর্মকর্তারাই বলেছেন, বিগত সময়ে যেসব পুলিশ দলীয় পারপাস সার্ভ করত, যাদের দিয়ে বিরোধী দলকে নির্যাতন করে দমিয়ে রাখা যেত, যাদের দিয়ে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে বিরোধী মতকে নির্মূল করা যেত, সেসব কর্মকর্তাই পেতেন পুলিশ পদক।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী আমলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাজকর্ম না করেই পদক পেয়েছেন। আবার ভালো কাজ করেও অনেকে পাননি। তবে পদকটা সঠিক জায়গায় যাওয়া উচিত। আমি মনে করি বর্তমান সময়ে পলিটিক্যাল (রাজনৈতিক) বিবেচনায় পদক দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।