যুক্তরাষ্ট্রের কালোতালিকার মোক্ষম জবাব: ১০ মার্কিন জায়ান্টের ওপর চীনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা
ওয়াশিংটনের দেওয়া ধাক্কার মোক্ষম জবাব দিল বেইজিং। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের কালোতালিকাভুক্ত করার প্রতিক্রিয়ায় এবার ১০টি বড় মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে চীন। নিষেধাজ্ঞা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সিংহভাগই প্রতিরক্ষা এবং বিরল খনিজ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। আজ সোমবার (২২ জুন) চীন সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের ঠিক এক মাস পরই এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ এল। ওই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে দুই পরাশক্তির মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ককে কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প।
উভয় দেশই দ্বিপক্ষীয় শুল্ক কমানোর বিষয়ে একমত হলেও প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার প্রতিযোগিতা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন করে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
যে কারণে বেইজিংয়ের এই কঠোর পদক্ষেপ
চলতি মাসের শুরুতেই ওয়াশিংটন প্রায় ৮০টি চীনা কোম্পানি ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে কালোতালিকাভুক্ত করে। পেন্টাগনের দাবি ছিল, এসব প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনোভাবে চীনা সামরিক বাহিনীকে প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস দিয়ে সহায়তা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই তালিকায় আলিবাবা ও বাইদুর মতো টেক জায়ান্টদের পাশাপাশি চীনের শীর্ষ বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডিকেও (BYD) যুক্ত করা হয়েছিল। ওয়াশিংটনের এই মারমুখী আচরণের পরপরই বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে:
”মার্কিন সরকার তাদের তথাকথিত ‘চীনা সামরিক এন্টারপ্রাইজ তালিকায়’ আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম যোগ করে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অন্যায় কাজ করেছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে এবং চীনের জাতীয় নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থেই এই নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলো।”
নিষেধাজ্ঞার কবলে যেসব মার্কিন প্রতিষ্ঠান
চীনের এই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মহাকাশ প্রতিরক্ষা চুক্তি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাভিওক্স এবং সামরিক যানবাহন প্রস্তুতকারক সংস্থা ওশকোশ ডিফেন্স। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিরল খনিজ উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এমপি মেটেরিয়ালস এবং ইউএসএ রেয়ার আর্থ-এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তালিকাভুক্ত এই ১০টি প্রতিষ্ঠানকে কোনো প্রকার ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ (যা সামরিক ও বেসামরিক—উভয় কাজেই ব্যবহার করা যায়) সামগ্রী বা কাঁচামাল সরবরাহ করা চীনা রপ্তানিকারকদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে চলমান সব ধরনের রপ্তানি চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের যেকোনো দেশ বা অঞ্চলের কোনো সংস্থা যদি চীনে উৎপাদিত এই দ্বৈত ব্যবহারের সামগ্রী ওই ১০টি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর বা বিক্রি করে, তবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে বেইজিং।
সরকারি কেনাকাটায় নিষিদ্ধ আরও ৪৬ কোম্পানি
এদিকে চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় পৃথক এক ঘোষণায় জানিয়েছে, দেশটির সব ধরনের সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন, বোয়িংয়ের প্রতিরক্ষা বিভাগ, জেনারেল ডাইনামিকস এবং অ্যান্ডুরিল ইন্ডাস্ট্রিজসহ মোট ৪৬টি মার্কিন কোম্পানির পণ্য কেনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূলত এই প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন প্রতিরক্ষা খাতের মূল ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয় আশ্বস্ত করে বলেছে, যেসব মার্কিন বিনিয়োগযুক্ত প্রতিষ্ঠান সরাসরি চীনের মূল ভূখণ্ডে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে। আজ সোমবার থেকেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে।
তাইওয়ান ইস্যু ও ট্রাম্পের অবস্থান
এর আগে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির জেরে ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও চীন এই কোম্পানিগুলোর বেশ কয়েকটির ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। বেইজিংয়ের ক্রমাগত সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় তাইওয়ান মূলত ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। চীন অবশ্য বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে।
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি মাসেই জানিয়েছেন, তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিশাল সামরিক সহায়তা প্যাকেজ বর্তমানে ‘পর্যালোচনার অধীন’ রয়েছে।
অবশ্য গত মে মাসে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর থেকে ট্রাম্প দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক হিসেবেই প্রচার করার চেষ্টা করছেন। এমনকি গত সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধে ‘নিরপেক্ষ’ ভূমিকা বজায় রাখার জন্য চীনের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, দুই দেশের ভেতরের স্নায়ুযুদ্ধ এখনো থামেনি।