হাসপাতালের চিকিৎসাবর্জ্য দিয়ে বার্ধক্যরোধী ওষুধ! পাকিস্তানে আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের বিরুদ্ধে তদন্তে এফআইএ
দেখতে ছিমছাম একটি আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে বোঝার বিন্দুমাত্র উপায় নেই ভেতরে কী ভয়ঙ্কর ও অদ্ভুত এক কারবার চলছে! তবে ঘরের ভেতরে পা রাখতেই চোখ চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়। সারি সারি ট্রলির ওপর ট্রেতে সাজানো রয়েছে সদ্য প্রসূতি নারীদের শরীর থেকে বের হওয়া শত শত গর্ভফুল (প্লাসেন্টা)। হাসপাতাল থেকে নামমাত্র মূল্যে এসব মানব টিস্যু সংগ্রহ করে এখানে শুকানো এবং প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছিল। উদ্দেশ্য—বিদেশে পাচার।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সম্প্রতি এমন একটি আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফআইএ)। উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৫০০ কেজি মানব গর্ভফুল। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় ইতিমধ্যেই পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
যেভাবে চলত এই গোপন বাণিজ্য
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বরাতে বিবিসি উর্দু জানিয়েছে, চক্রটি প্রতি মাসে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডির বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রায় ২০০ কেজি গর্ভফুল সংগ্রহ করত। পাকিস্তানের হিউম্যান অর্গান ট্রান্সপ্লান্ট অথরিটির কর্মকর্তা হিনা কানওয়াল জানান, হাসপাতালগুলো থেকে প্রতিটি প্লাসেন্টা মাত্র ৮০০ পাকিস্তানি রুপিতে (প্রায় ২.৯০ মার্কিন ডলার) কেনা হতো। এরপর সেগুলো গোপন আস্তানায় এনে শুকিয়ে ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হতো। গত ১ জুলাই ইসলামাবাদ বিমানবন্দরে এমনই প্রায় ১০০ কেজির একটি চালান জব্দ করে এফআইএ।
প্লাসেন্টা দিয়ে কী হতো?
তদন্তে জানা গেছে, পাচার হওয়া এই মানব গর্ভফুল দিয়ে বিদেশে তৈরি হতো উচ্চ মূল্যের ‘অ্যান্টি-এজিং’ বা বার্ধক্যরোধী ইনজেকশন। বাজারে একেকটি ইনজেকশনের মূল্য প্রায় ৭ লাখ রুপি (প্রায় ২ হাজার ৫৩০ মার্কিন ডলার)। গ্রেপ্তারকৃতরা প্রথমে এগুলো ভেড়ার গর্ভফুল বলে দাবি করলেও, পরে জেরার মুখে স্বীকার করে যে এগুলো সবই মানুষের শরীর থেকে নেওয়া।
ঝুঁকি ও আইনি বিধান
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, সন্তান প্রসবের পর প্লাসেন্টা একটি ‘অত্যন্ত সংক্রামক চিকিৎসাবর্জ্য’ হিসেবে গণ্য হয়। পাকিস্তানের স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ সাদাফ তারিক জানান, এই বর্জ্য অপসারণ ও ধ্বংসের ক্ষেত্রে কঠোর বৈশ্বিক বিধিনিষেধ রয়েছে এবং এটি কেবল সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানেরই করার কথা। যদিও কিছু মহলের দাবি, প্লাসেন্টার প্রোটিন ও উপাদান বার্ধক্য রুখতে সাহায্য করে, তবে এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ অত্যন্ত সীমিত।
পাকিস্তানি আইন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মানব অঙ্গ বা টিস্যু সংগ্রহ এবং পাচারের অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ রুপি জরিমানার বিধান রয়েছে। এফআইএ ধারণা করছে, এই চক্রের জাল লাহোর, পেশোয়ারসহ অন্যান্য বড় শহরেও ছড়িয়ে রয়েছে এবং এর সাথে হাসপাতাল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন।