কুষ্টিয়ায় ৬ ছাত্র-জনতা হত্যা: মানবতাবিরোধী অপরাধে জাসদ সভাপতি ইনুর ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার নির্দেশ ও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত এই রায়ের মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের ষষ্ঠ মামলার রায় ঘোষিত হলো।
মামলার প্রেক্ষাপট ও আইনি প্রক্রিয়া
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে এই মামলার তদন্ত শুরু হয়। একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) জমা দেয় প্রসিকিউশন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে গত বছরের ২ নভেম্বর আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
এরপর ৩০ নভেম্বর সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে ১ ডিসেম্বর থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে ২ জন সাফাই সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন। চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল শুরু হওয়া যুক্তিতর্ক গত ১৩ মে শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়। সর্বশেষ গত ২২ জুন ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেছিলেন।
ইনুর বিরুদ্ধে প্রমাণিত ৮টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
আদালতে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়:
- ১ম অভিযোগ: ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় এক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে বলপ্রয়োগের উসকানি ও হত্যার নির্দেশ।
- ২য় অভিযোগ: ১৯ জুলাই গণভবনে ১৪-দলীয় জোটের বৈঠকে উপস্থিত থেকে আন্দোলন দমনে বিতর্কিত ‘শুট অ্যাট সাইট’ (দেখামাত্র গুলি) সিদ্ধান্তের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে সহায়তা।
- ৩য় অভিযোগ: ছবি দেখে আন্দোলনকারীদের তালিকা তৈরি এবং তাঁদের আটক ও নির্যাতনের জন্য কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোনে নির্দেশ প্রদান।
- ৪র্থ অভিযোগ: গণ-আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং হেলিকপ্টার থেকে বোমাবর্ষণের পরিকল্পনা।
- ৫ম অভিযোগ: গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন জোগানো।
- ৬ষ্ঠ অভিযোগ: ১৪-দলের সভায় উপস্থিত থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
- ৭ম অভিযোগ: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ রেখে আন্দোলন দমনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা।
- ৮ম অভিযোগ: ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলী বাবু, আশরাফুল ইসলাম, বাবলু ফরাজী ও আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিনসহ ছয়জনকে হত্যার সরাসরি নির্দেশ প্রদান। একই সঙ্গে দেশজুড়ে ১ হাজার ৪০০ হত্যাকাণ্ড ও ২৫ হাজার মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় উসকানি দেওয়া।
আজ রায় ঘোষণার সময় আসামি হাসানুল হক ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায় পড়ার সময় আদালত কক্ষ ও এর আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়।