ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১৭০০, ধ্বংসস্তূপে এখনো চলছে উদ্ধার অভিযান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভেনেজুয়েলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গত সপ্তাহে আঘাত হানা ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৭১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। ধসে পড়া ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো হাজার হাজার মানুষ আটকে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে দিন-রাত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির নেতা হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, এই ভয়াবহ দুর্যোগে আহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ৩৪ জনে পৌঁছেছে। ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের পর প্রায় ১৫ হাজার ৮৬৬ জন মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।
ক্যারিবীয় উপকূলে নতুন আফটারশক, আতঙ্ক:
এরই মধ্যে গত সোমবার (২৯ জুন) উত্তর উপকূলীয় কারাবালেদা শহরের অদূরে ৪.৬ মাত্রার একটি শক্তিশালী আফটারশক (অনুকম্পন) অনুভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, নতুন এই কম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।
নতুন করে এই কম্পনের ফলে রাজধানী কারাকাসের চাকায়ো এলাকার বহুতল ভবনগুলো থেকে বাসিন্দারা আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসেন। ৫১ বছর বয়সী বাসিন্দা কনসেপসিওন হার্নান্দেজ বার্তা সংস্থা এপি-কে বলেন, “আমরা আবার রাস্তায় নেমে এসেছি। জানি না কবে আমরা সত্যিকারের শান্তি পাব ও ঘরে ফিরতে পারব।”
অলৌকিক উদ্ধার, আশাবাদী প্রশাসন:
ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধারের অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘৭২ ঘণ্টার গোল্ডেন আওয়ার’ গত শনিবার সন্ধ্যায় পার হয়ে গেছে। তবে এরপরও গতকাল রোববার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বেশ কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করায় উদ্ধারকারীদের মনে আশার আলো দেখা যাচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, “আজও আমরা মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছি। তাই উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হচ্ছে না, আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা ধরে রাখছি।”
এদিকে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি অলৌকিক উদ্ধারের গল্প শেয়ার করেছেন। তিনি জানান, ভেনেজুয়েলা, মেক্সিকো এবং এল সালভাদরের উদ্ধারকারী দলগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় লা গুয়াইরা শহরের একটি ধসে পড়া ভবন থেকে দীর্ঘ ১০৬ ঘণ্টা পর অ্যারন লেভি (২১) নামে এক তরুণকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
চলছে বিশাল আন্তর্জাতিক ত্রাণ তৎপরতা:
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৩০ হাজার জরুরি কর্মী এবং ২ হাজার ৭০০ বিদেশি বিশেষজ্ঞ উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছেন। ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত তারা ২৪টি দেশের কাছ থেকে ৫০০ টনের বেশি ত্রাণ সামগ্রী ও ৮৬টি বিশেষ অনুসন্ধানী কুকুর দলসহ (K9 Units) বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিনিধি তেরেসা বো লা গুয়াইরা থেকে জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পানি ও খাবারের মতো জরুরি সাহায্য পৌঁছাতে শুরু করেছে। তবে অনেক বাসিন্দা এখনও খোলা আকাশের নিচে তাঁবুতে রাত কাটাচ্ছেন। স্বজনরা ধ্বংসস্তূপের বাইরে অশ্রুসজল চোখে তাদের প্রিয়জনদের জীবিত অথবা অন্তত মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
রাজনৈতিক সংকটের মাঝে নতুন চ্যালেঞ্জ:
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ভেনেজুয়েলায় গত জানুয়ারি মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অপসারিত হন। এরপর গঠিত নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।