মিয়ানমারে জান্তার ৬ মাসের নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত ৭ শতাধিক: জাতিসংঘ
মিয়ানমারে বহুল বিতর্কিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাত্র ছয় মাসেই সাত শতাধিক বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে দেশটির জান্তা সরকার। গতকাল সোমবার (২২ জুন) জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জাতিসংঘ নিশ্চিত করেছে, নিহতদের একটি বড় অংশই নারী ও শিশু।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা দেশে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে সহিংসতা চরম রূপ নেয়। গত জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে অন্তত ৭০২ জন সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩টি শিশু রয়েছে।
আকাশপথে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলা দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় ও দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল যুদ্ধবিমান, ড্রোন, প্যারামোটর ও জাইরোকপ্টার ব্যবহার করে চালানো আকাশপথের হামলাতেই ৫০৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের প্রায় ৫৭ শতাংশ। এই আকাশযান হামলায় নিহতদের মধ্যে ১৭৫ জন নারী ও ১১২টি শিশু রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে স্পষ্ট ভাষায় বলেন:
”তদন্তে উঠে আসা এই ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিকের নির্মম মৃত্যুর জন্য সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীই দায়ী।”
তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, এটি মোট হতাহতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। জাতিসংঘের হাতে আসা সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই কেবল এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। জান্তাবিরোধী অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায়ও কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
প্রহসনের নির্বাচন ও গৃহযুদ্ধ
২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করেছিলেন জেনারেল মিন অং হ্লাইং। এরপর থেকে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে দেশটি এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
টানা সামরিক শাসনের পর আন্তর্জাতিক চাপ ও নিজেদের বৈধতা প্রমাণের অংশ হিসেবে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি নামমাত্র নির্বাচনের আয়োজন করে জান্তা সরকার। বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং ব্যাপক কারচুপির ওই নির্বাচনে জান্তা সমর্থিত ও মিত্র দলগুলো কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়। তবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এই নতুন প্রতিবেদন জান্তা সরকারের সেই ‘নির্বাচনী বৈধতা’র দাবিকে আবারও বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল।