সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ উত্থাপন; অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল
স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবহার করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ক্ষতিকর বিস্তার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে সংসদে উত্থাপিত হয়েছে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’। প্রস্তাবিত এই নতুন আইনে অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী দোষীদের সর্বোচ্চ সাত বছরের কঠোর কারাদণ্ড, বিপুল আর্থিক জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) সংসদ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জয়নুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই ঐতিহাসিক ও যুগোপযোগী বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন।
১৮৬৭ সালের ব্রিটিশ আইনের অবসান:
বিলটি উত্থাপনের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, “বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া কার্যক্রমের দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার মোকাবিলা করতেই মূলত এই নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে ডিজিটাল পেমেন্ট ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়া ও বেটিং ব্যাপকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের প্রাচীন ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ দিয়ে এসব আধুনিক সাইবার ও ডিজিটাল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। বিদ্যমান আইনি কাঠামোকে যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এই বিল আনা হয়েছে।”
একনজরে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’-এর মূল ধারা ও আইনি কাঠামো:
প্রস্তাবিত এই নতুন আইনে ডিজিটাল যুগের অপরাধের গভীরতা বিবেচনা করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যুক্ত করা হয়েছে—
সর্বোচ্চ শাস্তি: অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী দোষীদের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড, আর্থিক জরিমানা বা উভয় দণ্ডের সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো রাখা হয়েছে।
আধুনিক ডিজিটাল সংজ্ঞা: নতুন বিলে অনলাইন ও দূরবর্তী জুয়া, ডিজিটাল সম্পদ ও ক্রিপ্টো ওয়ালেট, পেশাদার বুকমেকার, টোটালাইজেটর, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো আধুনিক ধারণাগুলোর নিখুঁত আইনি সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ: বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর তা আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ‘আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে’ প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা: স্থায়ী কমিটিকে আগামী ৫ দিনের মধ্যে এই বিলের ওপর চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই প্রতিবেদন সংসদে দাখিলের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
অর্থপাচার ও সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে আরও উল্লেখ করেন, ‘অনলাইন জুয়া এখন আর কেবল সাধারণ সামাজিক সমস্যা নয়, এটি সাইবার নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং দেশীয় অর্থপাচারের (মানি लॉन्ডারিং) মতো বড় অর্থনৈতিক অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। অনেক আন্তর্জাতিক বা বিদেশি প্ল্যাটফর্ম জুয়ার আড়ালে বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের সংবেদনশীল তথ্য ও কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে।’ সাইবার ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, ফুটবল লিগ ও ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তরুণদের মধ্যে অনলাইন বেটিংয়ের আসক্তি জনশৃঙ্খলা ও যুবসমাজের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। এই নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ধ্বংস করতে আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিটিআরসি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।