গুজরাটে বাড়ি ভাঙার ভয়েই কি তৃণমূল ছাড়লেন ইউসুফ পাঠান?
ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক তারকা অলরাউন্ডার এবং পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী লোকসভা সদস্য (এমপি) ইউসুফ পাঠানকে নিয়ে ওপার বাংলায় শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তোলপাড়। গুজরাটে তাঁর কোটি টাকার বিলাসবহুল বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ভয়েই কি তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ছেড়েছেন?—এমন একটি বিস্ফোরক প্রশ্ন এখন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে ইউসুফ পাঠানের জমি নিয়ে আইনি সংকট এবং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে এই নাটকীয় পরিস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে।
২০ কোটির সরকারি জমি দখল ও নিলামের নোটিশ
ঘটনার সূত্রপাত গুজরাটের ভদোদরা শহরের তানদালজা এলাকায়। ২০১২ সালে ইউসুফ পাঠান ওই এলাকার প্রায় ৯৭৮ বর্গমিটারের একটি সরকারি প্লট ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেওয়ার আবেদন করেন। ভদোদরা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (ভিএমসি) কোনো প্রকাশ্য নিলাম ছাড়াই জমিটি পাঠানের নামে বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করলেও ২০১৪ সালে গুজরাটের নগর উন্নয়ন দপ্তর তা বাতিল করে দেয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রকাশ্য নিলাম ছাড়া এই জমি দেওয়া সম্ভব ছিল না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বরাদ্দ বাতিল হওয়ার পরও গত ১২ বছর ধরে কোনো টাকা পরিশোধ না করেই জমিটি কাঁটাতারের বেষ্টনী দিয়ে নিজের দখলে রেখেছিলেন পাঠান। ২০২৪ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর আসন থেকে তৃণমূলের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরই বিজেপি-নিয়ন্ত্রিত পৌরসভা তাঁকে জমি ছাড়ার নোটিশ পাঠায়। সম্প্রতি গুজরাট হাইকোর্টও জমিটির বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। বর্তমানে ওই জমির বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি ৫০ লাখ রুপি। পৌরসভা এখন এই জমি প্রকাশ্যে নিলামে তোলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভয়ের রাজনীতি ও দলত্যাগের গুঞ্জন
জমি সংক্রান্ত এই আইনি জটিলতার মধ্যেই তৃণমূলের ভেতরে শুরু হয়েছে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিদ্রোহ। ইউসুফ পাঠান সম্প্রতি তৃণমূলের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, যারা সংসদে মূল দল থেকে আলাদা হয়ে নতুন ব্লক গঠনের চেষ্টা করছে।
এই দলবদলের পেছনে বিজেপি সরকারের ‘বুলডোজার আতঙ্ক’ কাজ করেছে বলে চাঞ্চল্যকর দাবি উঠেছে। জম্মু-কাশ্মীরের সংসদ সদস্য আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন যে, সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে এক মুসলিম এমপি ইউসুফ পাঠানকে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, তিনি যদি সংসদে বিরোধী দলের আন্দোলনে বেশি সক্রিয় হন, তবে গুজরাটের বিজেপি সরকার তাঁর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেবে।
তৃণমূলে কাদা-ছোড়াছুড়ি: মহুয়া মৈত্রের ক্ষোভ
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূলের শীর্ষ নেত্রী মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, পাঠানকে ভয় দেখানো ওই মুসলিম এমপি ছিলেন এআইএমআইএম (AIMIM) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি। ওই সময় মহুয়া নিজেই পাঠানকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন যে দল তাঁর পাশে থাকবে।
ইউসুফ পাঠানের এই দলবিরোধী অবস্থানের পর মহুয়া মৈত্র তীব্র আক্রমণ করে লিখেছেন, “খুব আফসোস হচ্ছে, আমি এমন একজন বিশ্বাসঘাতকের জন্য লড়াই করেছিলাম, যাঁর কোনো সাহস বা মেরুদণ্ড নেই। এর চেয়ে মাঠে ক্রিকেট ধারাভাষ্য দেওয়া তাঁর জন্য অনেক ভালো ছিল।”
পাল্টা জবাবে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি তৃণমূল নেতৃত্বকে ধুয়ে দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ইউসুফ পাঠান ছাড়াও তৃণমূলের আরও ১৯ জন এমপি কেন দল ছাড়লেন বা বিদ্রোহী হলেন, সেই ব্যর্থতার দায় দলটির শীর্ষ নেতারা এড়াতে পারেন না।
বিজেপির ‘বুলডোজার নীতি’র ভয় নাকি নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ—কোন কারণে ইউসুফ পাঠান মাঠের ক্রিকেট ছেড়ে রাজনীতির পিচে এসে এমন ‘হিট উইকেট’ হইলেন, তা নিয়ে এখন দলটিতে চলছে তীব্র চুলচেরা বিশ্লেষণ।
তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬)