২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১১ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

জেলে যেতে হত্যা, বর্ণনা গা-শিউরে উঠার মতো

নারায়ণগঞ্জে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর অপরাধীরা। মাদকের সহজলভ্যতা ও হাতের নাগালে পেয়ে শিশু-কিশোররা মাদকসেবন করে নেশায় বুঁদ হয়ে খুন-রাহাজানির মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে  জড়িয়ে পড়ছে।

এমনই অপরাধের বলি হয়েছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার রেলস্টেশন এলাকার নিরপরাধ শিশু হোসাইন (১১)। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা গা-শিউরে উঠার মতো; যা গোয়েন্দা কাহিনী বা সিনেমার গল্পকেও হারা মানায়।

এমন ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর ৬ কিশোর অপরাধী ছিল ভাবলেশহীন। নেই কোনো অপরাধবোধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে অকপটে হত্যাকাণ্ডের বিশদ বর্ণনা তুলে ধরেছে।

কে কিভাবে শিশু হোসাইনকে প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে যায়, সেখানে তাকে কিভাবে হত্যা করেছে- তার বিষদ বিবরণ দেয় ওই ছয় কিশোররা।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের প্রথম বড় অপরাধে জড়িত হওয়ার কারণে সব কিছু সহজে স্বীকার করেছে।

শিশু-কিশোরদের এমন ভয়াবহ অপরাধে জড়িয় পড়ার বিষয়ে রাষ্ট্রর দুর্বল কাঠামোকেই দায়ী করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। নিম্নআয়ের পরিবারে দরিদ্রতার কশাঘাতে বেড়ে উঠা এবং সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের অবহেলা, কঠোর শাসনের অভাবকে দায়ী করেছেন কেউ কেউ।

ফতুল্লা রেলস্টেশনসংলগ্ন আশপাশে বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে পরিবারে সঙ্গে বসবাস করেন সাইফুল, তানভীর ও ইউনুস, হোসাইন, ওমর , রাহাত। সবার পরিবারই কিছুটা নিম্নআয়ের।  দরিদ্রতার কশাঘাতে স্কুলে পড়াশোনা করতে পারেনি।  কারো বাবা ভ্যানচালক, আবার কেউবা অটোরিকশা, দিনমুজরি করে সংসার চালান। বাবা-মায়ের কঠোর শাসনের অভাবে অল্প বয়সেই বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মিশে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ, স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র ফুটে এসেছে যুগান্তরের অনুসন্ধানে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়,  ১৯ এপ্রিল সাইফুল, তানভীর ও ইউনুস, হোসাইন, ওমর, রাহাত ৬ বন্ধু মিলে ফতুল্লা রেলস্টেশন বসে গাঁজা সেবন করে। স্টেশনের পাশে মেলা চলার কারণে সিদ্ধান্ত নেয় নাইট স্টে করবে তারা। যেই কথা সেই কাজ। সারারাত জেগে সকালে বাসায় যায়। এ কারণে ছয়জনই রাতে বাসায় না আসার অপরাধে পরিবারের সদস্যদের হাতে মারধরের শিকার হয়।

বাসায় মারধরের শিকার হয়ে ২০ এপ্রিল রাত ৯টার দিকে আবার তারা মিলিত হয় রেলস্টেশন এলাকায়। সেখানে ওমর তাদের জন্য গাঁজা নিয়ে আসে। সেখানে বসে তারা সেবন করে। পরে সাইফুল, তানভীর ও ইউনুস, আলোচনা করে জেলে গেলে আর বাসার মারধর খেতে হবে না। আর জেলে যেতে হলে কাউকে খুনের মতো অপরাধ করতে হবে। সে অনুযায়ী পূর্বপরিচিত শিশু হোসাইনকে টার্গেট করে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কিশোর অপরাধী হোসাইন ফুল বিক্রেতা সুমন ও রোকসানা বেগমের ছেলে শিশু হোসাইনকে রেলস্টেশন এলাকা থেকে ডেকে  গাঁজা খাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মিঠু মিয়ার পরিত্যক্ত একতলা বাড়িতে নিয়ে আসে।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে হোসাইন প্রথমে শিশু হোসাইনের গলা চেপে ধরে। আর ওমর ও ইউনুস পা চেপে ধরে। হোসাইন এমনভাবে গলা চেপে ধরে এতে সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরে সাইফুল  চাকু বের করে। একে একে ওমর, ইউনুস, হোসাইন, তানভীর, সাইফুল, রাহাত শিশু হোসাইনের পেটে চাকু দিয়ে পোঁচ দেয়। এতে হোসাইনের পেটের নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসে। পরে তাদের শরীরে কোনো রক্ত আছে কিনা- তা একজন আরেকজনকে দেখতে বলে।

একজন আরেকজনকে দেখে বলে কোনো রক্ত নেই। এ সময় ইউনুস দেখে তার পায়ের স্যান্ডেলে রক্ত লেগে আছে। পরে তা মুছে ফেলে। এরপর সবাই হাত মুখ ধুয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে আবার স্টেশন গিয়ে সবাই মিলে গাঁজা সেবন করে যার যার বাড়ি চলে যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের এমন বিশদ বর্ণনা উঠে এসেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন ঢাকা বিভাগ সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, দেশের শিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের যে মৌলিক দায়িত্ব, সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারণেই শিশুরা এমন ভয়ঙ্কর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, এমন শিশু কিশোররা জেলখানা দেখতে কেমন, বা জেলে যাওয়ার জন্যই এমন খুন রাহাজানিতে জড়িয়ে পড়বে এটা অবিশ্বাস্য মনে হয়। পুলিশকে বলবো এটি আরও নিবিড়ভাবে তদন্ত করে দেখার জন্য। এর পেছনে অন্যকোনো কিছু জড়িত আছে কিনা? তবে এটা সত্য মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতার কারণে শিশু কিশোররা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এই মাদক বেচাকেনার সঙ্গে যারা জড়িত তারা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদককারবার করছে। মাদককারবারিদের ডিলার থেকে শুরু করে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের সমূলে উৎপাটন করতে না পারলে সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা অসম্ভব। তাই আগামী প্রজন্মকে মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বাবা মায়েদের সন্তানের প্রতি নজর বাড়াতে হবে তার সন্তান এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে না পারে।

নারায়ণগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) হাসিনুজ্জামান বলেন, হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর তাদের আরেক বন্ধু ইয়াসিনকে বলে আমরা জেলে যাওয়ার জন্য হোসাইনকে হত্যা করেছি।  ইয়াছিনকে দায়িত্ব দেয় শিশু হোসাইনের লাশের অবস্থা দেখে তাদের জানানোর জন্য। ইয়াছিন তাদের কথামতো পরিত্যক্ত মিঠুর বাড়িতে গিয়ে লাশ দেখে তাদের আবার ফোন করে লাশ আছে বলে জানায়। পরের দিন ২৪ এপ্রিল আবার ইয়াছিনকে ফোন করে লাশের কী অবস্থা দেখার জন্য পাঠানো হয়। ইয়াছিন লাশ দেখে ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে ফোন করে জানায় লাশ ফুলে গেছে। এ সময় লাশের কথা শুনে ফেলে পাশের চা দোকানি এক নারী ও আশপাশের লোকজন। পরে তারা ইয়াছিনকে ধরে রেখে পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ ইয়াছিনের দেখানো মতে শিশু হোসাইনের লাশ উদ্ধার করে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬ আসামিকে গ্রেফতার করে। আরেক আসামি পলাতক রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. আব্দুস সামাদ জানান, নারায়ণগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ আদালতের মাধ্যমে শিশু হোসাইন হত্যার মামলার আসামিরা বয়সে কিশোর হওয়ার কারণে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত গাজীপুর (কিশোর সংশোধনাগার) শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

ফতুল্লা থানার ওসি মাহবুব আলম জানান, হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয় আসামি বখাটে প্রকৃতির ও নেশাগ্রস্ত। সারা দিন বিভিন্ন কাজকর্ম করে রেলস্টেশনে বসে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবন করত। কিশোর অপরাধীদের পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে কেউ রিকশা চালিয়ে আবার কেউ বা দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি জানান,  শিশু হোসাইন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ৫ কিশোরসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইয়াছিন নামে এক কিশোর অপরাধী আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছে। তারা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। কে কিভাবে হোসাইনকে ডেকে এনে হত্যা করেছে।

তিনি বলেন, হোসাইনের সঙ্গে তাদের কোনো পূর্ব বিরোধ ছিল- তদন্তে এমন কোনো কিছু পাওয়া যায়নি। মূলত জেলে যাওয়ার কৌতূহল, খুন করলে জেলে যাওয়া যাবে- এমন মনোভাব থেকেই শিশুটিকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর তাদের আরেক বন্ধু ইয়াছিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় লাশের সম্পর্কে আপডেট দেওয়ার জন্য। তারই সূত্র ধরে হোসাইনের লাশ উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত ৬ জনই মাদকাসক্ত।

নিহত হোসাইন তার বাবা সুমনের সঙ্গে শহরে ফুল বিক্রি করত।

সর্বশেষ