যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বাসিন্দাদের স্থায়িত্ব এখন যেন কেবলই এক অতীত স্মৃতি। নব্বইয়ের দশকে যেখানে একেকজন প্রধানমন্ত্রী বছরের পর বছর ক্ষমতায় থেকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর্যাপ্ত সময় পেতেন, সেখানে বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। গত ১৫ বছরে দেশটিতে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হওয়ায় এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—যুক্তরাজ্য শাসন করা কি আসলেই এত কঠিন হয়ে পড়েছে, নাকি দেশটি ধীরে ধীরে ‘শাসন-অযোগ্য’ হয়ে উঠছে?
যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ আটজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনী লেখক, ৭২ বছর বয়সী বিখ্যাত ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডনও এখন ব্রিটিশ রাজনীতির এই ঝোড়ো গতির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন,
”ঘটনাপ্রবাহের পেছনে আমাকে চিরকাল দৌড়াতে হচ্ছে। বিদায়ী রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ) সরকারের সময় মাত্র এক বছরেই তিনবার নেতা বদল হয়েছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনে কিয়ার স্টারমারের লেবার পার্টি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ভেবেছিলাম রাজনীতিতে পুরোনো ছন্দ ফিরবে। কিন্তু দুই বছর না পেরোতেই স্টারমারের বিদায়ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে।”
পাহাড়সম অর্থনৈতিক সংকট ও ব্রেক্সিট ধাক্কা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্যের এই রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনে রয়েছে গভীর ও বহুমাত্রিক সংকট। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা কাটিয়ে ব্রিটেন আজও পুরোপুরি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
স্থবির মজুরি ও মূল্যস্ফীতি: দীর্ঘদিন ধরে মানুষের প্রকৃত মজুরি স্থবির হয়ে আছে। মাঝখানে কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট রেকর্ড মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
ব্রেক্সিট বিপর্যয়: ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) কারণে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে বলে ধারণা করা হয়।
ঋণের বোঝা ও উচ্চ ব্যয়: উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত শ্লথ এবং ঋণের বোঝা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ফলে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের সরকারি বন্ডের সুদহার এবং শিল্প খাতে বিদ্যুতের ব্যয় এখন সর্বোচ্চ।
বহুমাত্রিক লড়াইয়ে ঐতিহ্যবাহী নির্বাচনব্যবস্থায় ফাটল
ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীর জয়) নির্বাচনপদ্ধতি মূলত দ্বিমুখী রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য উপযোগী। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টিই ছিল দেশটির প্রধান দুই শক্তি। কিন্তু বর্তমানে এই দুই দলের আধিপত্যে ধস নেমেছে।
বর্তমানে ইংল্যান্ডে রাজনীতি রূপ নিয়েছে পাঁচমুখী লড়াইয়ে; আর স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে তা ছয়মুখী। প্রধান দুটি দলকে এখন মধ্যপন্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, অতি প্রগতিশীল গ্রিনস এবং কট্টর ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে-এর মতো দলগুলোর সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্বাধীনতার পক্ষের জাতীয়তাবাদী দলগুলোর উত্থান, যা দীর্ঘদিনের অখণ্ড যুক্তরাজ্যের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলছে।
‘দেশটি শাসন-অযোগ্য নয়, ব্যর্থতা প্রধানমন্ত্রীদের’
ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাররা লেবার পার্টিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী আগস্টে ঋষি সুনাকের জীবনী প্রকাশের আগেই হয়তো ডাউনিং স্ট্রিট নতুন আরেকজন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবে। আর তা হলে সেটি হবে গত সাত বছরের মধ্যে ষষ্ঠবারের মতো প্রধানমন্ত্রী বদলের ঘটনা। স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে এখন জোরেশোরে আলোচনা চলছে লেবার পার্টির আইনপ্রণেতা অ্যাঞ্জেলা রেনারের নাম।
তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘ভালো সরকার গঠন অসম্ভব’—এমন হতাশা তৈরি হলেও জীবনীকার অ্যান্থনি সেলডন একে পুরোপুরি শাসন-অযোগ্যতা বলতে নারাজ। তাঁর মতে, এই তত্ত্ব আসলে খোদ প্রধানমন্ত্রীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতাকেই আড়াল করে।
তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, “ব্রিটেন কোনোভাবেই শাসন-অযোগ্য নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী দেশটিকে শাসন-অযোগ্য করে তুলতে যেন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন।”
পাহাড়সম অর্থনৈতিক সংকট, ব্রেক্সিটের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত এবং একের পর এক নেতৃত্বের ধারাবাহিক ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।