মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ: চরম আতঙ্কে মার্কিন সেনারা!
ইরানের মাটিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হামলার নির্দেশের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪ সপ্তাহ। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের ভাগ্যে শান্তি বা যুদ্ধ—কোনোটিই জোটেনি। এক অদ্ভুত ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন তারা। একে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধও বলা যাচ্ছে না, আবার শান্তির ন্যূনতম আভাসও এতে নেই। এক দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার চোরাবালিতে আটকে গেছে বিশ্বের অন্যতম পরাক্রমশালী এই বাহিনী।
রণক্ষেত্রে স্নায়ুযুদ্ধ ও ‘লেভেল-১০’ অ্যালার্ট
গত এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সাথে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ প্রায় বন্ধ করে রেখেছে ইরান। এর জবাবে মার্কিন নৌবাহিনীও ইরানি বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রাখায় প্রায় দিনই দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে।
এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটি ও রণতরিগুলোতে থাকা মার্কিন সেনাদের ২৪ ঘণ্টা সর্বোচ্চ সতর্ক বা ‘লেভেল-১০ অ্যালার্ট’-এ থাকতে হচ্ছে। চোখের পলকে যেকোনো বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হতে পারে—এমন মানসিক চাপ নিয়ে ড্রোন, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের কাজ করতে গিয়ে সেনারা চরম শারীরিক ও মানসিক অবসাদের শিকার হচ্ছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক কমান্ডার জোসেফ ভোটেলের মতে, যুদ্ধবিরতির নাটকীয়তার মাঝে সেনাদের এভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা নেতৃত্বের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করছে।
ফুরিয়ে আসছে গোলাবারুদ, বিপাকে পেন্টাগন
এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর (ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্র) ব্যবহারের ফলে পেন্টাগনের সমরাস্ত্রের মজুতে বড় ধরনের টান পড়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই ক্ষতি কাটিয়ে অস্ত্রাগার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ শুধু অস্ত্রই ফুরাচ্ছে না, বরং মার্কিন সামরিক যন্ত্র ও জনবলের ওপর চরম ধকল সৃষ্টি করছে।
”মনে হচ্ছিল একটি ছোট বিমান ধেয়ে আসছে, এরপরই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ, আগুনের কুণ্ডলী আর উত্তাপ… আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।”
— কোরি হিকস, ড্রোন হামলায় আহত মার্কিন সার্জেন্ট।
ঘরে-বাইরে বাড়ছে অসন্তোষ ও ক্ষত
পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী, চলমান এই সংঘাতে এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং প্রায় ৪০০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকেরই ‘ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি’ বা মাথায় গুরুতর চোট রয়েছে, যা তাদের সারা জীবনের জন্য পঙ্গু করে দিতে পারে। যেমনটি ঘটেছে ৩৭ বছর বয়সী সার্জেন্ট কোরি হিকসের ক্ষেত্রে, যিনি ড্রোন হামলায় তার সহযোদ্ধাদের হারিয়ে নিজে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন।
এদিকে সেনাদের পরিবারের মধ্যেও চরম উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। মাঠপর্যায়ের সঠিক তথ্য না পাওয়া এবং স্বজনদের মোতায়েনের মেয়াদ বারবার বাড়ানোর কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের এই সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি চারজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন এই অভিযানকে সমর্থন করছেন।
অমীমাংসিত ভবিষ্যৎ
যদিও ওয়াশিংটন ও তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার বিষয়ে আলোচনার টেবিলে বসার চেষ্টা করছে, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোনো চুক্তি হলেও তা কেবল যুদ্ধবিরতির মেয়াদই বাড়াবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো মূল ও জটিল সংকটগুলো অলিখিত এবং অমীমাংসিতই থেকে যাবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত মরুভূমিতে মার্কিন সেনাদের অন্তহীন অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার প্রহর আরও দীর্ঘ হতে চলেছে।
সূত্র- রয়টার্স