ওষুধ রপ্তানিতে নয়া দিগন্ত: প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৪০ শতাংশ ছাড়াল

October 4, 2026 • Times Asian24
medicine export 270526 01 1780372163
Share: Facebook X WhatsApp

দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করে চলেছে ওষুধশিল্প। প্রথাগত পোশাক খাতের বাইরে গিয়ে নীরবে এক বৈপ্লবিক সাফল্য অর্জন করছে এই খাত। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ওষুধ রপ্তানিতে ৪০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। টানা প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের অবস্থান আরও মজবুত হচ্ছে।

​রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ ৭ কোটি ৬৬ লাখ মার্কিন ডলারের ওষুধ বিদেশে পাঠিয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে ওষুধ রপ্তানি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি ডলার—যা আগের মাসের (আগস্ট) তুলনায় ১৮ শতাংশ এবং গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।

​পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দেড় দশকে দেশে ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ। ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি আয় ছিল ৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে। আগের দুটি অর্থবছর যথাক্রমে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫-এও যথাক্রমে ২০ কোটি ৫৪ লাখ ও ২১ কোটি ৩২ লাখ ডলারের রেকর্ড বাণিজ্য হয়।

​শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বজুড়ে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধের চাহিদা বাড়ায় বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যালসের অন্যতম উদীয়মান কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সভাপতি এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মুক্তাদির বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের ওষুধের বাজার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। সরকারি নীতিগত সমর্থন ও সহযোগিতা বজায় থাকলে আগামী অর্থবছরের মধ্যেই রপ্তানি আয় ৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।”

​বর্তমানে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের উন্নত বাজারগুলো অন্যতম। গত অর্থবছরের মোট রপ্তানির সিংহভাগই এসেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো, ইনসেপ্টা ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের হাত ধরে। শীর্ষ দশে থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে রেনাটা, একমি, অ্যারিস্টোফার্মা, এসকেএফ, জেনারেল, বিকন ও ওরিয়ন ফার্মা।

​তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার মাঝেও প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে কাঁচামাল বা অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টের (এপিআই) চরম আমদানিনির্ভরতা। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ওষুধের প্রায় ৯৮ শতাংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি হলেও, এর কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশই চীন ও ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় নির্মিত এপিআই শিল্পপার্ক দীর্ঘ দেড় দশকেও পূর্ণাঙ্গ রূপ না পাওয়ায় দেশীয় কাঁচামাল উৎপাদনে ধীরগতি রয়ে গেছে।

​বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েটস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএআইএমএ) জানায়, প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরাপত্তা ও নীতি সহায়তা পেলে স্থানীয়ভাবে দেশের মোট চাহিদার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল উৎপাদন সম্ভব। সংগঠনটির সভাপতি এস এম সাইফুর রহমান এ খাতের দ্রুত অগ্রগতি ও বৈশ্বিক সুযোগ কাজে লাগাতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানান।

​সামনে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ এবং মেধাস্বত্ব আইনের শর্তাবলীর কারণে খাতটিতে নতুন চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়োপযোগী পলিসি সাপোর্ট, কাঁচামালের নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নমুনা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে তৈরি পোশাকের মতোই ওষুধশিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *