ইসলামী ব্যাংক নিয়ে অন্যান্য ব্যাংক প্রধানদের উদ্বেগ
ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান পরিস্থিতি আমানতকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি)। তাদের মতে, দেশের বৃহত্তম ব্যাংকটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অস্থিরতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতেই পড়তে পারে।
বুধবার (১০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এ উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এতে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি ও সিইওরা অংশ নেন।
সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সেটি এখন আর শুধু একটি ব্যাংকের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর পড়ছে, যা ব্যাংকারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মাসরুর আরেফিন জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও বিষয়টিকে এখন শুধুমাত্র ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে বিবেচনা করছেন না। তার মতে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান পরিস্থিতি ইতোমধ্যে রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করেছে। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকটিকে ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে এবং বিষয়টি যেভাবে ক্রমশ রাজনৈতিকীকরণের দিকে যাচ্ছে, তা উদ্বেগের কারণ। এই ধরনের পরিস্থিতি আমানতকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়।
বৈঠকে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ প্রসঙ্গে মাসরুর আরেফিন বলেন, গভর্নর ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)-তে সঠিক, নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে ঋণ সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অসঙ্গতি না থাকে।
সভায় দেশের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এবিবি চেয়ারম্যান জানান, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ সহায়তা প্যাকেজ প্রণয়নের কাজ চলছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্স স্কিমের আওতায় এই অর্থ উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে বলে তিনি জানান।
এছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভুলতা নিয়েও গভর্নর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানান মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, রফতানি ও আমদানি সংক্রান্ত তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা কিংবা নির্ধারিত সময়ের পর জমা দেওয়ার কারণে জাতীয় হিসাব-নিকাশে নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে আমদানি পণ্যের মূল্য ঘোষণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইনভিত্তিক তথ্যসূত্র ব্যবহার করে আমদানি পণ্যের প্রকৃত মূল্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ ধরনের যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করা গেলে অতিমূল্যায়িত আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা যাবে।