এক বুক আতঙ্ক আর চোখের জল: ৮৬০০ কর্মীকে বিদায় দিল মেটা-লিংকডইন
একটা সময় ছিল যখন মেটা (ফেসবুক) কিংবা লিংকডইনের মতো বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করাকে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য মনে করা হতো। আকর্ষণীয় বেতন আর রাজকীয় সুযোগ-সুবিধার কারণে এই চাকরিগুলো ছিল তরুণদের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মেটা থেকে ৮ হাজার এবং লিংকডইন থেকে ৬০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পর এখন সিলিকন ভ্যালি জুড়ে চলছে তীব্র হাহাকার আর অনিশ্চয়তা।
প্রতিদিনের শুরু ছাঁটাইয়ের আতঙ্ক দিয়ে
সিলিকন ভ্যালীর কর্মপরিবেশ এখন আর আগের মতো আনন্দময় নেই, বরং সেখানে ভর করেছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেটার এক কর্মী জানান, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়ার আগে চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে মেইল চেক করতে হয়—চাকরিটা এখনো আছে নাকি চলে গেছে।
অফিসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ কতটা গুমোট হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ মিলছে কর্মীদের নিজস্ব চ্যাট গ্রুপগুলোতে। সেখানে এখন শুধুই রাজত্ব করছে ‘ডার্ক হিউমার’ বা কালো কৌতুক। কর্মীরা কঙ্কালের নাচের মিম আর ধ্বংসের জোকস শেয়ার করে নিজেদের মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা এআই-কে উন্নত করতে তাদের দৈনন্দিন কাজের ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। এক প্রকার বাধ্য হয়েই কর্মীরা এমন এক প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যা অদূর ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের চাকরিই কেড়ে নেবে।
থমকে গেছে ব্যক্তিগত জীবন, বাড়ছে মানসিক রোগ
এই ব্যাপক ছাঁটাইয়ের মানসিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে শুরু করেছে। অনেক কর্মী জানিয়েছেন, তীব্র উদ্বেগের কারণে তারা ব্যক্তিগত জীবনের বড় সিদ্ধান্তগুলো, যেমন—নতুন বাড়ি কেনা, সন্তান নেওয়া, ব্যাংক ঋণ নেওয়া কিংবা পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার মতো পরিকল্পনাগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ আগামী তিন মাস পর পকেটে বেতন থাকবে কি না, তা নিয়ে কেউ নিশ্চিত নন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, হঠাৎ এই চাকরিচ্যুতি বা এর সার্বক্ষণিক ভয় কর্মীদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। এটি মানুষকে গভীর বিষণ্ণতা ও পরিচয় সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এবং মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে।
মেটাভার্স অতীত, টেক জায়ান্টদের পাখির চোখ এখন ‘এআই’
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলো এখন তাদের ব্যবসার পুরো মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। মেটা তাদের এক সময়ের স্বপ্নের প্রকল্প ‘মেটাভার্স’-কে পেছনে ঠেলে দিয়ে এখন সম্পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছে এআই-এর দিকে। এমনকি সাইবার সিকিউরিটি বা গ্রাহক সেবার মতো সংবেদনশীল বিভাগেও মানুষের বদলে স্বয়ংক্রিয় এআই সিস্টেম চালু করা হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, এআই বা রোবট কখনোই মানুষের সৃজনশীলতা, সহানুভূতি এবং মানবিক বুদ্ধিমত্তার বিকল্প হতে পারবে না। কিন্তু করপোরেট দুনিয়ার বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা—সেখানে মানুষ নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
ভালো লভ্যাংশের পরও লিংকডইনে ছাঁটাই
চাকরি খোঁজার জনপ্রিয় মাধ্যম লিংকডইনের কর্মীরাও এই ধাক্কা থেকে রেহাই পাননি। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউ সদর দপ্তরসহ বিশ্বজুড়ে তাদের মোট কর্মীবাহিনীর প্রায় ৫ শতাংশ বা ৬০০ জন কর্মীকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, লিংকডইনের রাজস্ব বা আয় কিন্তু কমেনি, বরং দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। এরপরও কোম্পানির সিইও ড্যানিয়েল শাপেরো এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য অর্জনের জন্য এবং কাজের ধরনকে নতুনভাবে সাজাতে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এআই-এর নাম নেওয়া না হলেও, কর্মীরা ঠিকই বুঝতে পারছেন যে ভবিষ্যৎ বাজারের জন্য টিম ছোট করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
শেষ হলো ‘নিরাপদ টেক চাকুরির’ সোনালী অধ্যায়
বিগ টেক কোম্পানিগুলো কর্মীদের যে নিরবচ্ছিন্ন সুরক্ষার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা যে আসলে একটা রূপকথা ছিল—তা এখন স্পষ্ট। ক্যাম্পাসগুলো এখনো চকচক করছে, বেতনও হয়তো এখনো অনেক বেশি, কিন্তু চাকরিগুলোর সাথে জড়িয়ে থাকা মানসিক শান্তিটুকু চিরতরে হারিয়ে গেছে। মেটা ও লিংকডইনের হাজার হাজার কর্মীর কাছে এখন চাকরি হারানোর চেয়েও বড় ক্ষত হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সার্বক্ষণিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক অস্থিরতা।