পশ্চিমবঙ্গে গরু কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা: বিপাকে হিন্দু কৃষকরা, ক্ষোভ

মে ২০, ২০২৬ Times Asian24
1779265253 d0096ec6c83575373e3a21d129ff8fef
Share: Facebook X WhatsApp

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের গবাদিপশু কেনাবেচায় নতুন বিধিনিষেধ জারির পর রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন রাজ্যের হিন্দু কৃষকরা। দলটির নিজস্ব মুসলিম নেতারাই স্বীকার করছেন, পবিত্র ঈদুল আজহার মুখে এই নিষেধাজ্ঞা বিজেপিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে ফেলে দিয়েছে।

​এদিকে এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে মাঠে নেমেছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির দাবি, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে আঘাত করতে গিয়ে বিজেপি মূলত রাজ্যের সমগ্র গ্রামীণ অর্থনীতিকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

​শাঁখের করাত বিজেপি: খোদ নেতারাই চিন্তিত

​গত ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার দিন পর, অর্থাৎ ১৩ মে বিজেপি সরকার একটি নির্দেশিকা জারি করে। সেখানে বলা হয়, সরকারি কয়েকটি দপ্তরের অনুমতি এবং গবাদিপশুর বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার সনদ ছাড়া তা কেনাবেচা করা যাবে না।

​এই নির্দেশিকার ফলে কোরবানির ঈদের আগে পশ্চিমবঙ্গে বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছে গরুর হাটগুলো। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার প্রভাবশালী বিজেপি নেতা ইউনুস আলী সংবাদমাধ্যমকে জানান, বিষয়টি দলকে কিছুটা সমস্যায় ফেলেছে। তবে ঈদুল আজহার আগেই পরিস্থিতি সামলে নেওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

​পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির সমীকরণ টেনে এই বিজেপি নেতা বলেন:

​”পশ্চিমবঙ্গে মূলত হিন্দু ও গোপালক ঘোষেরা গরু লালন–পালন করেন এবং দুধ বিক্রি করেন। একটি পর্যায়ের পর অর্থের প্রয়োজনে তারা মুসলিমদের কাছে গরু বিক্রি করে দেন। এই চক্রটি বুঝতে কিছুটা ভুল হওয়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। হিন্দুরা যদি গরু পালন বন্ধ করে দেন, তবে মিষ্টি ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার বিরাট ধাক্কা খাবে।”

​‘গরিবের পেটে লাথি মারছে বিজেপি’: মহুয়া মৈত্র

​বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই বিজেপি গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর সাংঘাতিক আঘাত হেনেছে। গ্রামগঞ্জের পশুর হাটগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

​টুইট (এক্স) বার্তায় মহুয়া লিখেছেন:

​”বিজেপি সরকার একটি সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে এ কাজ করার চেষ্টা করলেও চোট সব গরিব মানুষের গায়েই লাগবে। কারণ ঘোষ, দাসদের মতো হিন্দু সম্প্রদায়ও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।”

​পার্লামেন্টের তথ্য উদ্ধৃত করে তৃণমূলের এই ফায়ারব্র্যান্ড নেতা আরও দেখান যে, ২০২৪-২৫ সালে ভারত থেকে মাংস রপ্তানি করে ৪০ হাজার কোটি টাকা আয় হয়েছে এবং মহিষের মাংস বিক্রির বড় করপোরেট সংস্থা ‘অ্যালানা গ্রুপ’ বিজেপির তহবিলে ৩০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে। মহুয়ার প্রশ্ন, “করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে অনুদান নেওয়া বা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করায় বিজেপির অন্যায় নেই, কিন্তু গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরে ব্যবসা বন্ধ করে আপনারা কী প্রমাণ করতে চান?”

​কৃষকদের কান্নায় ভারী বাতাস, আত্মহত্যার হুমকি

​সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে হাজারো হিন্দু গোপালকের দুর্দশার চিত্র। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা ক্যামেরার সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

​ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, বছরের এই সময়ে গরু বিক্রি করে তারা লাখ টাকা রোজগার করেন, যা দিয়ে কৃষিঋণ ও ক্ষুদ্রঋণ (মাইক্রোক্রেডিট) সংস্থার ধার মেটানো হয়। বিধিনিষেধ শিথিল করা না হলে আত্মহত্যা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না বলে অনেকেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

​সমাধানের খোঁজে দল

​বিজেপি নেতা ইউনুস আলী বলেন,বিষয়টি দল খতিয়ে দেখছে। তবে স্থানীয় মুসলিমদের কারণে তার ওপরও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন:

​”আসলে বিজেপি তো হিন্দুদের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে। ফলে তাদের কিছু একটা করতে হতো, যাতে ভোটাররা বোঝে তাদের সরকার এসেছে। এখন সেটা করতে গিয়েই সমস্যা হয়েছে। আশা করি শুভেন্দু অধিকারী (মুখ্যমন্ত্রী/নেতা) এর একটি সমাধান সূত্র বের করবেন।”
​বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করতে গিয়ে বিজেপি যেভাবে নিজেদের ভোটব্যাংক তথা হিন্দু কৃষকদেরই অর্থনৈতিক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তা আগামী দিনে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি দলটির জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *