জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, কুড়িগ্রাম দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনপদ। এই জেলা থেকেই শুরু হবে আমাদের উন্নয়নের যাত্রা। আমার কাছে দাবি জানাতে হবে না। বঞ্চিতদের আর মিছিল করতে হবে না। উন্নয়ন করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। কুড়িগ্রামকে কৃষি শিল্পের রাজধানীতে পরিণত করব। কৃষি বিপ্লব হলে সবাই কাজ পাবেন। বঞ্চিত এ এলাকা যেন আল্লাহ মনি-মুক্তায় ভরিয়ে দেন।
তিনি আরও বলেন, কুড়িগ্রামের প্রধান দুঃখ তিনটি বড় নদী। নদীগুলো হত্যা করে মরুভূমি বানানো হয়েছে। রাষ্ট্রের বাজেট সব চুরি করা হয়েছে। ২৮ লাখ কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ দিলে এসব টাকা পেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনব।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতের জয় চাই না, আমরা চাই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। আর বিভক্তি নয়। আমরা কোনো দলীয় রাষ্ট্র কায়েম করতে চাই না। এ বিজয়ে আমি তিস্তাপাড়ের মানুষের মাঝে গণজোয়ার দেখছি। আমরা দেশে আধিপত্যবাদীদের ক্ষমতা দেখতে চাই না, আমরা চাই সমতা।
তিনি বলেন, রংপুরের সন্তান শহীদ আবু সাঈদ বুক পেতে দিয়ে বলেছেন, অধিকার দাও, না হলে গুলি। সাঈদ বুকে তিন তিনটি গুলি নিয়েছেন বীরের মতো। এখান থেকে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সাঈদ, মুগ্ধ, হাদিসহ ১ হাজার চার শতাধিক শহীদ হয়েছেন। তাদের রক্তে নদী গুলো লাল হয়েছে। আমরা এ রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব না। তারা জীবন দিয়ে দেশের যে আমানত আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন, সেই আমানত রক্ষায় প্রয়োজনে আমরাও জীবন দিতে প্রস্তুত।
শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জামায়াত কাজ করে যাবে জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, তাদের প্রত্যাশা ছিল একটি দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশ গড়া। আমাদের নিজস্ব কোনো স্বপ্ন নেই-তাদের স্বপ্নই আমাদের স্বপ্ন।
তিনি একটি দলের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, তারা নারীদের গায়ে, মা-বোনদের গায়ে হাত দিচ্ছেন। তারা হুমকি দিচ্ছেন- কাপড় খুলে নেবেন। তারা বলছেন, হিজাব পরে আসলে খুলে ফেলো, তাদের যেখানে পাও ঠেকিয়ে দাও। লজ্জা লজ্জা। এরা কি মায়ের পেট থেকে আসেনি? তাহলে মায়ের জাতের গায়ে হাত দেয় কীভাবে? আপনারা ভয় পাবেন না। চোখে চোখ রেখে কথা বলবেন।
জামায়াত আমির বলেন, এটি আমার বাংলাদেশ, আপনাদের দেশ। এই বাংলাদেশে আর কোনো জমিদার মেনে নেব না। এই দেশ হবে জনগণের। আমরা মায়েদের কথা দিচ্ছি এ দেশে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। জামায়াত ক্ষমতা পেলে এ দেশে আর নারীরা ধর্ষণের শিকার হবে না। আপনাদের রাস্তাঘাট, কর্মস্থল সব জায়গায় শতভাগ নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করব। যে দেশে মায়েদের কোনো নিরাপত্তা নেই। সে দেশ আমার হতে পারে না। আমরা জাতি ধর্ম দেখব না। সব ধর্মের নারীদের সম্মান করা আমাদের বড় দায়িত্ব।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, এখন একটি গোষ্ঠী আমার পেছনে লেগেছে। আমার এক্স আইডি হ্যাক করে যা-তা চালিয়ে দিয়েছে। আর অমনি একটা দল ঝাঁপিয়ে পড়ে তাইরে নাইরে গান শুরু করেছে। লজ্জা, ওদের চুনোপুঁটির সঙ্গে বড় বড় মাথাগুলোও গাইতে শুরু করেছে। কিন্তু তারা পেরে ওঠেনি, আমাদের সাইবার টিম তাদের গলা টিপে ধরেছে, সত্য কখনো ধামাচাপা দেওয়া যায় না। ইতোমধ্যে মেইন কালপ্রিটকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সত্য মেঘের আড়ালে ঢাকা থাকে না। সূর্যকে মেঘ ঢেকে রাখতে পারে না।
মঞ্চে কুড়িগ্রাম-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী এবং কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন প্রধান অতিথি ডা. শফিকুর রহমান। এছাড়া কুড়িগ্রাম-২ আসনের ১১ দলীয় জোট সমর্থিত এনসিপির প্রার্থী ড. আতিকুর রহমানকে শাপলা কলি মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
কুড়িগ্রাম জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আজিজুর রহমান স্বপনের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য দেন- এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নিজাম উদ্দিন, সহ-সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হামিদ, শাহজালাল হক সবুজ, জেলা বায়তুলমাল সম্পাদক জহরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট ইয়াসিন আলী, এনসিপির জেলা আহ্বায়ক মুকুল মিয়া, খেলাফত মজলিসের রংপুর অঞ্চলের সহকারী পরিচালক সবের মিয়া প্রমুখ।
জামায়াত আমির বলেন, দমন-পীড়ন কিংবা সংকট-কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণকে ছেড়ে যায়নি জামায়াত; ভবিষ্যতেও যাবে না। জীবন চলে গেলেও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করব না।
তিনি বলেন, জামায়াত প্রতিহিংসার রাজনীতি করে না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অন্যতম নির্যাতিত মজলুম দল জামায়াত; কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দলটির কোনো নেতাকর্মী প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি করেননি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো চাঁদাবাজ-বাটপারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকবে না। দলীয়ভাবে আমরা কোনো প্রতিশোধ নেব না। এছাড়া কোনো মামলাবাণিজ্য করব না।
কুড়িগ্রাম-৪ (চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর) আসনের জামায়াতের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর সেতু করে এই তিন উপজেলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন করা হবে।
কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, দুর্নীতির কারণে দীর্ঘ ৫৪ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত ছিলাম। হ্যাঁ ভোট দিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারব আমরা।
কুড়িগ্রাম-১ (নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী) আসনের জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে এ জনপদে শিল্প, কল-কলকারখানা তৈরি করে বেকারত্ব দূর করব।
কুড়িগ্রাম-২ (কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট ও ফুলবাড়ি) আসনের এনসিপির প্রার্থী ড. আতিকুর রহমান বলেন, কুড়িগ্রাম রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের কারণে বিছিয়ে পড়া জনপদ। আর পিছিয়ে থাকতে চাই না। ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে কুড়িগ্রামের বঞ্চনা দূর করতে চাই। দুর্নীতি আর চাঁদাবাজির রাজনীতি পরিহার করে কর্মসংস্থানের রাজনীতি করতে চাই। নদীর বাঁধ নির্মাণ এবং চরাঞ্চলের উন্নয়নে কাজ করতে চাই।
আখতার হোসেন বলেন, ১২ তারিখের প্রথম ভোট হবে হ্যাঁ, তারপর হবে সরকার গঠনের ভোট। কোথাও আমরা আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না। দেশে কোনো চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি থাকবে না, সব সিন্ডিকেট ভেঙে আমরা চুরমার করে দেব। হ্যাঁ ভোট হলো আজাদি আর না হলো গোলামির। আমরা ইনসাফভিত্তিক মানবিক রাজনীতি করতে চাই।