দেশের রাজনীতিতে আগামী দিনে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এজন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দলে জায়গা করে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে দলটি। তবে মূলত ‘রিফাইন্ড’ বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ, জুলাই যোদ্ধা এবং বিএনপির পদবঞ্চিত নেতাদের টার্গেট করেছে তারা। বিভিন্ন সূত্র এবং দলটির কয়েকদিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে এমন কৌশলের কথা জানা গেছে।
রোববার আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ (আপ বাংলাদেশ) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন-এই তিন দল, প্ল্যাটফর্ম ও সংগঠনের ৪৪ জন নেতা এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। তাদের ফুল দিয়ে বরণ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এই যোগদানের পরপরই রাজনৈতিক মহলে জুলাই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ এই দলটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এনসিপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ এবং বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলসহ কয়েকটি সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী এনসিপিতে যোগদান করবেন। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী এনসিপিতে যোগ দিতে যোগাযোগ করছেন বলেও দাবি করেন তারা।
রোববার যোগদান অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম বলেছেন, এনসিপিতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কারও সাবেক পরিচয় মুখ্য নয়। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ, এমনকি ছাত্রলীগ হোক-তার সাবেক পরিচয় আমাদের কাছে মুখ্য নয়। তবে কোনো ফ্যাসিবাদী কার্যক্রম, গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী, গণহত্যাকে সমর্থনকারী, চাঁদাবাজ, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ও সন্ত্রাসীকে কখনোই এনসিপিতে আসতে দেওয়া হবে না বা থাকতে পারবে না।
এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিন সোমবার যুগান্তরকে জানান, দুটি বড় রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন ছাত্রদল, ছাত্রলীগসহ দলগুলোর অন্য অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতাকর্মী এনসিপিতে যোগদান করবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের আহ্বায়ক বিষয়গুলো একেবারেই পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, যে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এনসিপিতে যোগদান করতে পারবে। আমরা তাদের সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করব।’
এদিকে সাবেক যুবদল নেতা ও ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ইসহাক সরকার এনসিপিতে যোগ দেবেন বলে গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিগ্গিরই তিনি এনসিপিতে যোগ দিতে পারেন। একটি সূত্রের দাবি, তার যোগদান প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতির দায়িত্বও তাকে দেওয়ার বিষয়ে এনসিপিতে আলোচনা চলছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় সংসদ-সদস্য হতে চেয়েও মনোনয়ন না পাওয়া ও পদবঞ্চিত ক্ষুব্ধ নেতাদের কেউ কেউ দলটিতে যোগ দিতে পারেন। সারা দেশে এমন বেশকিছু নেতার সঙ্গে এনসিপির আলোচনা চলছে বলে দলটির নেতারা দাবি করেছেন।
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র সংসদ-সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন-এমন খবরও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। অবশ্য তিনি এ ধরনের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম এনসিপিতে যোগ দিতে পারেন বলেও দেশের রাজনীতিতে আলোচনা আছে। এনসিপি নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ-সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রামে মঞ্জুর আলমের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলে এ আলোচনার সূত্রপাত হয়। তবে মঞ্জুর আলম দাবি করেছেন, হাসনাতের সঙ্গে তার রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। মঞ্জুর আলম ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন।
এরপর ২০১৫ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত মেয়র নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন পেলেও নির্বাচিত হতে পারেননি তিনি। তবে তাকে আর বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা যায়নি। এরপর ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০২০ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েও পাননি মঞ্জুর আলম।
এক বছরেও কম বয়সি দল এনসিপি ডান, বাম, ইসলামপন্থি মধ্যপন্থি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন আদর্শ ও মতের মানুষের সমন্বয়ে একটি নতুন ধারার রাজনীতি গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। তবে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থি কয়েকটি দলের সঙ্গে ঐক্য করার ঘটনায় এনসিপির ভেতরে-বাইরে আলোচনা-সমালোচনাও রয়েছে। অবশ্য নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের নেতৃত্বাধীন দলটি জুলাই চেতনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অন্যদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বেশকিছু নেতাকর্মী এনসিপির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে জানা গেছে। তবে তাদের ব্যাপারে দলীয় প্রধান নাহিদ ইসলাম একটি ‘গাইডলাইন’ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এমন কাউকে দলে নেওয়া যাবে না, যার জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে সক্রিয় অবস্থান ছিল। তার মতে, এতে দলের ইমেজ ক্ষুণ্ন হবে। তাই এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করছে দলটি। সারা দেশে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী পালিয়ে বা আত্মগোপনে রয়েছেন। তারাও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য প্ল্যাটফর্ম বা মাধ্যম খুঁজছে। সূত্রের দাবি, এমন নেতারা ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে নানা মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি এনসিপিতে যোগ দেওয়ারও চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। তবে এনসিপি অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের লোকদের গুরুত্ব দেবে।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে সম্মুখসারির একদল তরুণের নেতৃত্বে গঠিত দল এনসিপি ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জাতীয় সংসদে ৬টি আসন পেয়েছে। দলের প্রধান নাহিদ ইসলামকে বিরোধী দলের চিফ হুইপের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনেও তাদের ২ জন প্রতিনিধি আসছেন সংসদে। দলটি এখন তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য সংসদে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনও গতিশীল করতে তৎপর রয়েছে। দল বড় করতে সদস্য সংগ্রহ তাদের এখন অন্যতম প্রধান কর্মসূচি বলে জানা গেছে।