ইউরোপজুড়ে তীব্র দহন: স্কুল বন্ধ, পানিতে ডুবে ৪০ মৃত্যু
যুক্তরাজ্যসহ সমগ্র ইউরোপজুড়ে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বাস্তবতায় পুড়ছে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, জার্মানি ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো। বিভিন্ন অঞ্চলে পারদ চড়েছে ৩৮ থেকে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। তীব্র গরমে একদিকে যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে চরম মানবিক বিপর্যয়। বিশেষ করে ফ্রান্সে এই তীব্র দাবদাহ থেকে একটু স্বস্তি পেতে নদী, হ্রদ কিংবা সমুদ্রে নামতে গিয়ে পানিতে ডুবে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে হাজারো স্কুল।
ফ্রান্সে ৪৪ ডিগ্রি পার, পানিতে ডুবে ৪০ তরুণ-যুবকের মৃত্যু
ফরাসি আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিসো এলাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৪৭ সালে ফ্রান্সে আধুনিক পদ্ধতিতে আবহাওয়ার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর, জুনের ইতিহাসে এটি অন্যতম তীব্র ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ।
তীব্র গরমের হাত থেকে বাঁচতে নদী ও জলাশয়ে নামাই কাল হয়েছে বহু মানুষের। ফরাসি প্রশাসন জানিয়েছে, গত ১৮ জুন থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন, যাদের বড় অংশই তরুণ। কোনো লাইফগার্ড বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই তারা জলাশয়ে নেমেছিলেন। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিলের সঙ্গে চলমান তাপপ্রবাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ‘হিট ডোম’ আতঙ্ক: বন্ধ সহস্রাধিক স্কুল
এদিকে যুক্তরাজ্যেও পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই তীব্র গরমে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সহস্রাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, না হয় ক্লাস সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। পূর্ব লন্ডনের বার্কিংয়ের জর্জ কেরি চার্চ অব ইংল্যান্ড প্রাইমারি স্কুলসহ বহু নামী স্কুল শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। অনেক স্কুলে ইউনিফর্মের কড়াকড়ি শিথিল এবং খেলাধুলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া বিভাগ (মেট অফিস) এবং স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা (ইউকেএইচএসএ) যৌথভাবে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। লন্ডনসহ দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দাদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত তাপে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার আশঙ্কায় ট্রেন চলাচলের গতি কমিয়ে দিয়েছে পরিবহন কর্তৃপক্ষ।
“৫০ বছরে এমন গরম দেখিনি”
৫৩ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী জালাল উদ্দিন তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক তাপপ্রবাহের পর ব্রিটেনে আর কখনো এমন গরম দেখিনি। আবহাওয়ার চরিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। একসময় লন্ডনের শীত মানেই ছিল ভারী তুষারপাত, এখন বরফই দেখা যায় না। আর গ্রীষ্মের তাপমাত্রা প্রতি বছরই আগের রেকর্ড ভাঙছে। আমরা চোখের সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা দেখছি।”
কারণ ও অতীত ভয়াবহতা
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর আফ্রিকা থেকে ধেয়ে আসা প্রচণ্ড উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ এবং বায়ুমণ্ডলে তৈরি হওয়া ‘হিট ডোম’ বা তাপ-বলয়ের কারণেই ইউরোপের এই নরকগুলজার পরিস্থিতি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ইউরোপ দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে।
ইউরোপে এমন চরম আবহাওয়া অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২২ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহে সমগ্র ইউরোপজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছিল। ওই বছরের ১৯ জুলাই ইংল্যান্ডের কনিংসবিতে দেশটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।
চলতি বছরের এই প্রারম্ভিক তাপপ্রবাহ পরিবেশবিদদের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। বিশ্বনেতারা যদি এখনই কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তবে অদূর ভবিষ্যতে ইউরোপের এই গ্রীষ্মকালীন দহন আরও প্রাণঘাতী রূপ নেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।