সৌদি আরবের উদ্যোগে বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে সক্রিয় হচ্ছে ১৩ দেশের নৌ-জোট
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘বাব আল-মান্দেব’ প্রণালীকে ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের দখল থেকে মুক্ত করতে এবার বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেন উপকূলের কৌশলগত এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত ১৩ দেশের বহুজাতিক নৌ-প্রতিরক্ষা জোট ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স কোয়ালিশন’ (এমএমডিসি)-কে সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আজ শনিবার সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় শহর জেদ্দায় জোটভুক্ত দেশগুলোর এক জরুরি বৈঠক শেষে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা প্রণালীজুড়ে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে যৌথ সামরিক অভিযানে নামার বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন।
উচ্চপর্যায়ের এই সামরিক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এমএমডিসি জোটের প্রধান ও সৌদি নৌবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরি। বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তা রক্ষা করা কোনো একক দেশের কাজ নয়, এটি একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এমএমডিসি-র প্রাথমিক সামরিক কার্যক্রম চালুর সক্ষমতা ঘোষণা করছি। বাণিজ্যিক জাহাজের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা কিংবা আন্তর্জাতিক জলসীমার নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টিকারী যেকোনো অপশক্তিকে কঠোর হাতে দমন করা হবে।”
উল্লেখ্য, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাব আল-মান্দেব প্রণালীটি ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত। এটি একদিকে লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সাথে যুক্ত করেছে, অন্যদিকে সুয়েজ খাল দিয়ে বৈশ্বিক পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের মূল ধমনী হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের মোট উত্তোলিত অপরিশোধিত খনিজ তেলের প্রায় ১২ শতাংশই এই পথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়।
গত ১১ সেপ্টেম্বর প্রণালীর মধ্যবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ময়উন’ (পেরিম) দ্বীপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি গোষ্ঠী হুথি। এর ফলে পুরো বাব আল-মান্দেব প্রণালীর ওপর তাদের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকেই এই জলপথ উদ্ধার করতে ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে সৌদি বিমানবাহিনী। আকাশপথে হামলার পাশাপাশি স্থল ও জলপথে সামরিক চাপ বাড়াতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত কেবল তথ্য ও গোয়েন্দা সহায়তা দিতে প্রস্তুত, সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না।
এর আগে, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর সংযোগকারী বাণিজ্যিক জাহাজের রুটে অবরোধ জারি করে হুথিরা। এতে বিশ্ব বাণিজ্যে চরম অস্থিরতা দেখা দিলে গত ৩১ জুলাই সৌদি আরবের উদ্যোগে গঠিত হয় ১৩ জাতির এই সমন্বিত সামরিক জোট এমএমডিসি।
সৌদি আরব ছাড়াও এই প্রতিরক্ষামূলক জোটে রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর, তুরস্ক, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান, জিবুতি, সোমালিয়া, সুদান, কোমোরেস এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সরকার। জোটে বাংলাদেশের মতো দেশের অংশগ্রহণের কারণে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামরিক গতিপ্রকৃতির ওপর ঢাকার নজরও এখন বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।