বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক এবার ইতিহাসের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ বা লাখ কোটি ডলারের মালিক হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েছেন। তার মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্পেসএক্স’ শেয়ার বাজারে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ায় মাস্কের সম্পদ এই অবিশ্বাস্য উচ্চতায় পৌঁছাতে যাচ্ছে। নাসডাক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাওয়া স্পেসএক্সের আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাবটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার (২০ মে) স্পেসএক্স তাদের আইপিও নিবন্ধনের নথিপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে কোম্পানির আয়-ব্যয়, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং মালিকানার বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে। নথিতে দেখা যায়, স্পেসএক্সে মাস্কের শেয়ার রয়েছে ৬৪০ কোটি মার্কিন ডলার। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আইপিও শুরু হয়নি, তবে সম্প্রতি বেসরকারি বাজারে স্পেসএক্সের প্রতিটি শেয়ার সর্বোচ্চ ১৩০ ডলারে কেনাবেচা হয়েছে। এই দাম অনুযায়ী, স্পেসএক্সে মাস্কের শেয়ারের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৮৩০ বিলিয়ন বা ৮৩ হাজার কোটি ডলার।
টেসলা ও স্পেসএক্স মিলে ১ লাখ কোটি ডলার পার
স্পেসএক্সের পাশাপাশি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলাতেও মাস্কের বড় অংকের মালিকানা রয়েছে। বর্তমানে টেসলায় তার শেয়ারের মূল্য প্রায় ২৯০ বিলিয়ন ডলার। স্পেসএক্স এবং টেসলার এই সম্পদ একসঙ্গে যোগ করলে কাগজে-কলমে মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার। স্পেসএক্সের আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার হিসেবে মাস্কের নাম ইতিহাসের পাতায় উঠবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ার বাজারে স্পেসএক্সের বাজার মূলধনের লক্ষ্যমাত্রা ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার ধরা হলেও, তালিকাভুক্তির পর তা ২.২ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগকারী মার্টিন রজার্স বলেন, তিনি যে ট্রিলিয়নেয়ার হচ্ছেন, তা নিশ্চিত। আর ইলন মাস্কের বিরুদ্ধে বাজি ধরাই হলো টাকা হারানোর সবচেয়ে বড় উপায়।
টেসলা নয়, মাস্কের সম্পদের মূল উৎস এখন স্পেসএক্স ও এআই
ইলন মাস্কের সম্পদের এই উল্লম্ফন প্রমাণ করে যে, তার আয়ের মূল উৎস এখন টেসলা থেকে স্পেসএক্সের দিকে সরে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক মহাকাশযান, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট (স্টারলিংক) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের তুমুল আগ্রহই এর প্রধান কারণ।
মাত্র তিন মাস আগে, স্পেসএক্স প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ারের বিনিময়ে মাস্কের তিন বছরের পুরোনো এআই স্টার্টআপ ‘এক্সএআই’-কে কিনে নেয়। এ চুক্তির ফলে এক্স প্ল্যাটফর্মের চ্যাটবট ‘গ্রোক’-এর মালিকানা এখন স্পেসএক্সের হাতে। ফলে কোম্পানিটি এখন কেবল সরকারি মহাকাশ ঠিকাদার নয়, বরং এআই খাতেরও একটি বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
গত বছর স্পেসএক্সের আয় ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ওয়েস্টপ্যাকের চেয়েও বেশি। মার্কিন ফান্ড ম্যানেজার রন ব্যারন সিএনবিসিকে বলেন, স্পেসএক্স এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোম্পানিতে পরিণত হবে এবং এর মূল্য ১৪ থেকে ৪২ ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
সম্পদের পরিমাণ পৌঁছাতে পারে ৬ ট্রিলিয়নে
ইলন মাস্কের এই সম্পদের পাহাড় এখানেই থামছে না। ২০২৫ সালের টেসলা ইনসেনটিভ প্যাকেজ এবং স্পেসএক্সের ক্ষতিপূরণ চুক্তি অনুযায়ী তিনি যদি সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেন, তবে তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন বা ৬ লাখ কোটি ডলার!
বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের বার্ষিক জিডিপি ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের ওপরে। জার্মানি ও জাপানের মতো উন্নত দেশের অর্থনীতিও যথাক্রমে ৫ ও ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এমনকি মাস্কের বর্তমান সম্পদই তাইওয়ানের বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের চেয়ে বেশি।
ধনাঢ্যতার ইতিহাসে নতুন রেকর্ড ও বিতর্ক
সাম্রাজ্য বা রাষ্ট্র শাসন না করে কোনো একক ব্যক্তির এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই প্রথম। বিখ্যাত তেল ব্যবসায়ী জন ডি রকফেলারকে (মৃত্যু ১৯৩৭) ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী পুঁজিপতি মনে করা হয়, বর্তমান মূল্যে যার সম্পদ ছিল প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। বুমবার্গ বিলিয়নেয়ার্স ইনডেক্স অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজের সম্পদও প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মাস্ক তাদের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে গেছেন।
তবে মাস্কের এই ট্রিলিয়নেয়ার হওয়ার খবর বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদ এবং বৈশ্বিক বৈষম্য নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মাইক্রোসফটের সাবেক নির্বাহী ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ড্যানিয়েল পেট্রে বলেন, কারো ১ বিলিয়ন ডলারেরও প্রয়োজন নেই। কোনো মানুষের এত টাকার কী দরকার, তার পক্ষে কোনো যৌক্তিক যুক্তি হতে পারে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এত বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকলে তারা দেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা পেয়ে যান। ধনকুবেরদের ওপর ৫০ শতাংশ ট্যাক্স আরোপের দাবিও তোলেন তিনি।
তবে মাস্কের সমর্থকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, মাস্কের এই সম্পদ তার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, কঠোর পরিশ্রম এবং মঙ্গল গ্রহে মানববসতি স্থাপনের মতো বড় স্বপ্নের ফসল। বিনিয়োগকারী মার্টিন রজার্স বলেন, সাধারণ মানুষ যেভাবে টাকার হিসাব করে, মাস্ক সেভাবে ভাবেন না। তিনি আক্ষরিক অর্থেই নিজের কারখানার মেঝেতে ঘুমান, এমন ত্যাগ স্বীকার করতে অনেকেই রাজি হবেন না।
সূত্র: সামা টিভি