আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র ‘বড় নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করতে এবার গ্রিনল্যান্ডের ওপর নজর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বীপটির ওপর মার্কিন আধিপত্য নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনে গত চার মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই তথ্য ফাঁস হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
কেন এই গোপন বৈঠক?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত তুলে ট্রাম্পের দাবি— আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব রুখতে গ্রিনল্যান্ড কৌশলগতভাবে ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত ট্রাম্পের ‘শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের হুমকি’র তীব্রতা প্রশমিত করা এবং এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ন্যাটো (NATO) জোটের মিত্রদের মধ্যে যাতে নতুন কোনো বড় ধরনের ফাটল বা উত্তেজনার সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই গোপন বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
সার্বভৌমত্ব হারানোর শঙ্কায় গ্রিনল্যান্ড
এদিকে এই গোপন আলোচনার খবর সামনে আসার পর গ্রিনল্যান্ডের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর এই আগ্রাসী পরিকল্পনাকে তারা সহজভাবে নিচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রিনল্যান্ডের এক নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন:
”বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংকট বা যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যস্ত থাকলেও, এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরপরই ওয়াশিংটন আবারও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে পূর্ণ শক্তিতে চাপ বাড়াতে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য: দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ঘাঁটি ও খনিজ সম্পদ।
নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী কিছু কৌশলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে:
অনির্দিষ্টকালের জন্য সেনা মোতায়েন: ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান সামরিক চুক্তিগুলো নিজেদের অনুকূলে পুনর্বিবেচনা ও সংশোধনের চেষ্টা করছে। তারা এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড যদি ডেনমার্ক থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রেও পরিণত হয়, তবুও মার্কিন সেনারা সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করতে পারে।
প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নজর: গ্রিনল্যান্ডের ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল, ইউরেনিয়াম এবং বিরল খনিজসম্পদের (Rare Earth Elements) ওপর চোখ পড়েছে ওয়াশিংটনের।
চীন-রাশিয়াকে প্রতিহত করা: বড় বড় অবকাঠামো ও বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে সেখানে রাশিয়া ও চীনের যেকোনো ধরনের অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ সীমিত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
পেন্টাগনের তোড়জোড় ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগন ইতোমধ্যে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে তাদের সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। তবে এই বিদেশি সামরিক আধিপত্য গ্রিনল্যান্ডের সাধারণ জনগণ কতটা মেনে নেবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ায় এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এমনিতেই বাড়ছিল। এখন যুক্তরাষ্ট্রের এই গোপন তৎপরতা ও সামরিক আগ্রাসনের নীতি বরফাবৃত আর্কটিক অঞ্চলকে এক উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে পারে।