ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের মাসিক সরকারি ভাতা আগামী জুন মাস থেকে সম্পূর্ণ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে নতুন মন্ত্রিসভা।
সোমবার (১৮ মে) নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশনানুযায়ী রাজ্যের বিদ্যমান অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি) তালিকা বাতিল করারও বড় ঘোষণা এসেছে।
বৈঠক শেষে রাজ্যের নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সাংবাদিকদের বলেন, “তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক দপ্তর এবং সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের অধীনে ধর্মীয় ক্যাটাগরিতে যে সমস্ত প্রকল্প চালু রয়েছে, সেগুলো চলতি মে মাসের শেষ পর্যন্ত চলবে। আগামী জুন মাস থেকে এগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে ধর্মীয় ভিত্তিতে দেওয়া ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতা আর দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও জানান, পুরনো ওবিসি তালিকা পুরোপুরি সংশোধন ও পুনর্বিবেচনা করে কোটার যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য একটি নতুন প্যানেল গঠন করা হবে।
ভাতার ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ইমামদের জন্য মাসিক ২,৫০০ রুপি এবং পরবর্তীতে মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা চালু করে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনা শুরু হলে, ২০২০ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার হিন্দু পুরোহিতদের জন্যও মাসিক ১,০০০ রুপি ভাতা চালু করে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এই পুরোহিত ভাতা বাড়িয়ে ২,০০০ রুপি করা হয়েছিল। শুভেন্দু সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এই সব ধরনের ধর্মীয় ভাতাই বন্ধ হতে যাচ্ছে।
নীতিগত বড় পরিবর্তনের আভাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইমাম ও পুরোহিতদের ভাতা বন্ধের এই সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। নতুন বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, জনকল্যাণমূলক কোনও কর্মসূচি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়।
দুর্নীতি ও নারী নির্যাতন তদন্তে কমিশন
ধর্মীয় ভাতা বন্ধের পাশাপাশি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও তহবিল বণ্টনে অনিয়ম তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ দাসের তত্ত্বাবধানে এই কমিশন কাজ করবে।
পাশাপাশি, রাজ্যে বিগত সময়ে নারীদের ওপর ঘটে যাওয়া সব ধরনের নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চ্যাটার্জির নেতৃত্বে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইপিএস কর্মকর্তা দময়ন্তী সেনকে সদস্য সচিব করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
বিগত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো এককভাবে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। আর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বৈঠকেই এমন সব কড়া ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির স্পষ্ট বার্তা দিল শুভেন্দু সরকার।