২রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৩ই রমজান, ১৪৪৭ হিজরি

সৌদি-ইসরাইলের জোরাজুরিতে হামলা চালায় ট্রাম্প

ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই আগ্রাসনে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে। এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট দিয়েছে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য। গণমাধ্যটির মতে, ইরানে হামলা করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্বুদ্ধ করেছিল সৌদি আরব ও ইরান।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্র দেশ কয়েক সপ্তাহের লবিংয়ের পর ট্রাম্পকে রাজি করায়। আয়াতুল্লাহ খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পরে সৌদি-ইসরাইলের পরামর্শে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, জনসমক্ষে ইরান সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলে এলেও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ভেতরে ভেতরে ছিলেন ভিন্ন। গত এক মাসে ট্রাম্পকে বেশ কয়েকবার ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে ইরানে মার্কিন হামলার পক্ষে কথা বলেন।

অপরদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শুরু থেকেই ইরানকে তার দেশের জন্য অস্তিত্বের হুমকি বিবেচনা করে আসছে। দেশটিতে মার্কিন হামলার জন্য দীর্ঘদিন প্রকাশ্য প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর ওপর বিমান হামলার নির্দেশ দেন। হামলার প্রথম ঘণ্টাতেই খামেনি ও ইরানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মৃত্যু হয়।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, আগামী এক দশকে ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি কোনো হুমকির আশঙ্কা ছিল না। তা সত্ত্বেও এই হামলা চালানো হয়েছে।

৯ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার একটি দেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো এমন পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান থেকে গত কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিরত রেখেছিল। শনিবারের এই হামলা সেই দীর্ঘকালীন মার্কিন নীতি থেকে বড় বিচ্যুতি। এটি ট্রাম্পের নিজের আগের সামরিক পদক্ষেপগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ আগে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলোর পরিসর ছিল সীমিত।

হামলার জন্য সৌদি আরব এমন এক সময়ে চাপপ্রয়োগ করে যাচ্ছিল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দেশটির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

সেই আলোচনা চলাকালীনই সৌদি যুবরাজ ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে ফোনালাপের পর রিয়াদ বিবৃতি দেয়। তাতে বলা হয়, মোহাম্মদ বিন সালমান ইরানে হামলার জন্য সৌদি আরবের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেবেন না।

তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় সৌদি নেতা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এখনই হামলা না চালায়, তবে ইরান ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। স্পর্শকাতর এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, যুবরাজ সালমানের এই অবস্থানকে সমর্থন জানান তার ভাই ও সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান। গত জানুয়ারিতে ওয়াশিংটনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনিও হামলা না চালানোর নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সতর্ক করেছিলেন।

সৌদি নেতার এই জটিল অবস্থানের পেছনে মূলত দুটি বিষয়ের টানাপোড়েন কাজ করেছে বলে মনে করছেন তার চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা। প্রথমত, নিজ দেশের তেল স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলা এড়ানোর ইচ্ছা; দ্বিতীয়ত, রিয়াদের প্রধান আঞ্চলিক শত্রু হিসেবে তেহরানকে দমন করার লক্ষ্য। শিয়া-অধ্যুষিত ইরান ও সুন্নি নেতৃত্বাধীন সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, যা এই অঞ্চলে বারবার প্রক্সি যুদ্ধের সূচনা করেছে।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক হামলার পর ইরান সত্যিই সৌদি আরবের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। এর জবাবে রিয়াদ এক ক্ষুব্ধ বিবৃতিতে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানায় এবং ইরানের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রয়োজনীয় ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। এই বিষয়ে মন্তব্য করার অনুরোধে সৌদি দূতাবাস কোনো সাড়া দেয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার তথ্যমতে, উইটকফ ও কুশনার গত বৃহস্পতিবার জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে শেষ বৈঠক করেন। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে এটি ছিল তাদের তৃতীয় উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ। তবে বৈঠক শেষে তারা এই ধারণা নিয়ে ফিরে আসেন যে, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেহরান আসলে তাদের সঙ্গে টালবাহানা করছে। এরপর শনিবার করা হয় নজিরবিহীন হামলা।

সর্বশেষ